দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন বাহিনীর নাম রাখা হচ্ছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এ লক্ষ্যে র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন আইন প্রণয়নের খসড়া প্রস্তুত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খসড়া আইনটি বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রস্তুতিতে রয়েছে। শিগগিরই এটি মন্ত্রিসভায় প্রাথমিক অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে নীতিগত অনুমোদনের জন্য আবার মন্ত্রিসভায় যাবে। পরে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হলে পাসের মাধ্যমে তা আইনে পরিণত হবে।
খসড়া আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত রাখতে র্যাব বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের সহায়ক একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে এসআরবি গঠন করা হবে। বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা, শৃঙ্খলা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বাহিনীকে অধিকতর জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অতীতে র্যাবের বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। নতুন আইনে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
খসড়া অনুযায়ী, র্যাবের সব সম্পদ, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, তহবিল, ব্যাংক হিসাব, নথিপত্র, চলমান দায়িত্ব ও দায়দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসআরবির কাছে হস্তান্তর হবে। বর্তমানে কর্মরত সব কর্মকর্তা ও সদস্যও একই শর্তে নতুন বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে থাকবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্ত্রাসবাদ দমন, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা এবং সরকার বা আদালতের নির্দেশে বিশেষ দায়িত্ব পালন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তল্লাশি, অভিযান পরিচালনা ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও থাকবে।
গত মাসে র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বাহিনীটির পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, মানবাধিকার ও জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স গঠনের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল র্যাবের সংস্কার কিংবা বিলুপ্তি। ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর এবং গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, র্যাবের দক্ষতা ও সক্ষমতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে নতুন যে নামেই বাহিনী গঠন করা হোক, তার কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
২০০৪ সালে সন্ত্রাস দমন ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত র্যাব দুই দশকে দেশের অন্যতম আলোচিত ও সমালোচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে পরিণত হয়। এখন সেই বাহিনীর জায়গায় নতুন কাঠামোয় এসআরবি গঠনের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায় সরকার।


