কারাগার থেকে বের হওয়ার এক মাসের মাথায় রাজধানীতে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হয়েছেন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন খান পলাশ (৫০)। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর রামপুরায় তাঁকে গুলি করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ বলেছে, ইয়াসিন খান পলাশ (৫০) ‘কাইল্লা পলাশ’ নামে পরিচিত। পুলিশের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’র তালিকায় তাঁর নাম আছে। একসময় তিনি যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল বেলা পৌনে দুইটার দিকে জুমার নামাজ পড়ে পলাশ বাসায় ফিরছিলেন। রামপুরার রয়েল মিষ্টির দোকানের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে এসে দুর্বৃত্তরা তাঁকে গুলি করে পালিয়ে যায়। তাঁর মাথায় দুটি গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ পলাশকে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় উদ্ধার করে বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পলাশের বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ইব্রাহিম মিয়া হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, এক যুবক পলাশের মাথায় গুলি করে কিছু দূরে থাকা একটি মোটরসাইকেলের পেছনে উঠে শূন্যে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যান। পলাশ এক মাস আগে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান বলে জানান ইব্রাহিম। তাঁর বাবার নাম ইউনুস খান।
ঘটনার পর পলাশের পরিচিত ও স্বজনেরা হাসপাতালে ভিড় করেন। তাঁর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আল আমিন হাসপাতালে প্রথম আলোকে বলেন, আগে থেকেই পলাশ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর পলাশ আশাবাদী ছিলেন তিনি বিএনপির কমিটিতে পদপদবি পাবেন। কারা, কেন পলাশকে গুলি করেছে, তা তিনি জানেন না বলে জানান।
সিসিটিভি দেখে হামলাকারী শনাক্তের চেষ্টা
ঘটনাটি ঘটেছে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অধীন। গতকাল বিকেলে জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভির (ক্লোজড সার্কিট টিভি) ফুটেজ দেখে হামলাকারী শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কারা, কেন হামলা করেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ কর্মকর্তা ইবনে মিজান বলেন, পুলিশের তালিকায় কাইলা পলাশ শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ হাতিরঝিল থানাতেই ১০টি মামলা রয়েছে। রামপুরা যুবদল নেতা মিজানুর রহমান হত্যা মামলায় ২০০৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৮-২০ বছর কারাভোগ করে মাসখানেক আগে তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন।
একসময় নিয়ন্ত্রণ করতেন রামপুরার অপরাধজগৎ
পুলিশ কর্মকর্তা ইবনে মিজান বলেন, কারাগারে থাকার আগে কাইল্ল্যা পলাশ আগে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে জেনেছেন।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়ার আগপর্যন্ত রামপুরা, বনশ্রী, মালিবাগের কিছু অংশ ও মহানগর প্রজেক্ট এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রভাবের অভিযোগ পুরোনো। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর রামপুরা ও খিলগাঁও এলাকার প্রতিপক্ষের অন্যান্য সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চলছিল।
কারাগারে থেকেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমানকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। ২০০৩ সালে ওই মামলায় পলাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন পলাশকে। পরে উচ্চ আদালত তাঁর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে কারাগারে থাকাকালে পরও তাঁর নামে চাঁদাবাজি, সহযোগীদের মাধ্যমে এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অপরাধ পরিচালনার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তখন রামপুরা থানার পুলিশ রেকর্ড বিশ্লেষণ করে কারাগারে থেকেও অনেক সিম ব্যবহারের তথ্য পেয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
আদালতে আনা–নেওয়ার পথে বাসায় যেতেন, তদন্তে উঠে আসে অনিয়ম
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে পলাশের স্ত্রী মাহমুদা মুন্সিগঞ্জ হাসপাতালে জন্ম দেন এক কন্যাসন্তানের। তার বয়স এখন ১২ বছর। কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে রামপুরার বাসায় দেখা করে যেতেন পলাশ। কখনো কয়েক ঘণ্টা, কখনো সারা দিন পরিবারের সঙ্গে থাকেন। প্রিজন ভ্যানে নয়, আসা-যাওয়া করতেন মাইক্রোবাসে করেই। বাড়ির বাইরে পাহারা দিত পুলিশ। এ ঘটনা ফাঁস হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই অভিযোগের সত্যতার তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই দণ্ডিত অপরাধীকে আদালতে আনা-নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ৩০৫ জন কারা ও পুলিশ সদস্যের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, তাঁদের ২৯৪ জন পুলিশ সদস্য, বাকি ১১ জন কারারক্ষী।
অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুনোখুনি
গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার পর তাঁকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর প্রায় দুই বছর দুই মাস আগে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার তেজগাঁওয়ের সড়কে যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় গুলি করে তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। ২৪ বছর কারাভোগের পর তখন কেবল তিনি বের হয়েছিলেন। সেদিন মামুন গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে ভুবন চন্দ্র শীল নামের একজন মোটরসাইকেল আরোহী সেদিন নিহত হন।
২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারের জোড়া খুনের ঘটনার মাধ্যমে মূলত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের খুনোখুনির ঘটনা শুরু হয়। ওই ঘটনায় আসামি ছিলেন ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল। এই মামলার আরেক আসামি ছিলেন রায়েরবাজারে কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ইমন হোসেন। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।


