গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন চুক্তি বা বিদ্যমান চুক্তি সংশোধনের বিষয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। তবে চুক্তিসংক্রান্ত বিষয়গুলো দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর আওতায় আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের যৌথ কমিটির বৈঠক কারিগরি পর্যায়ে অব্যাহত রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে পানি ও নদী সংক্রান্ত সব বিষয়ই দ্বিপক্ষীয় যৌথ নদী কমিশনের আলোচ্যসূচির অংশ হিসেবে আলোচনা করা হয়। তিনি বলেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে গঠিত যৌথ কমিটির বৈঠকগুলোও কারিগরি পর্যায়ে অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে গত ২৭ আগস্ট সংসদে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খালিলুর রহমান বলেন, অভিন্ন নদীগুলো থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন চুক্তি প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি দল গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে চুক্তিটি নতুন করে করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সংশোধনের বিষয়টিও সামনে আনা হয়েছে। ঢাকার অবস্থান হলো, নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করতে হবে এবং অভিন্ন নদীর পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খালিলুর রহমান সম্প্রতি মরিশাসে নবম ভারত মহাসাগর সম্মেলনে অংশ নিয়ে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি ব্যবস্থা ও নতুন চুক্তি বা সংশোধিত চুক্তি দেখতে চায়, যা বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করবে।
অভিন্ন নদীগুলোকে দুই দেশের অভিন্ন ঐতিহ্য ও স্বার্থের অংশ উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে দীর্ঘস্থায়ী একটি সমাধান প্রয়োজন। এমন একটি সমাধান দরকার, যা দুই দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করবে এবং আগামী ২৫ থেকে ৫০ বছরের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গঙ্গা বাংলাদেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রায় তিন দশক আগের বাস্তবতার ভিত্তিতে করা চুক্তিকে বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নতুন বাস্তবতায় পর্যালোচনার পরামর্শ : এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে শুধু চুক্তি নবায়ন করলেই হবে না; পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে পুরো ব্যবস্থাটির ব্যাপক পর্যালোচনা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, গত তিন দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের জনসংখ্যা, কৃষি, শিল্প, নগরায়ণ এবং পানির চাহিদায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নদীর পানিপ্রবাহ ও পানির প্রাপ্যতায় নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তাই নতুন চুক্তি প্রণয়নের সময় এসব বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু পানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদেরও
আলোচনায় যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শাহাব এনাম খান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রায় তিন দশক আগে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি করা হয়েছিল। এর মধ্যে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাই চুক্তিটি নবায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি সংশোধন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে করা চুক্তিকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন, পানির ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে গঙ্গা চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনায় দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নদী অববাহিকাভিত্তিক পানিব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন চুক্তি প্রণয়নে প্রস্তুতি শুরু হলেও এখন মূলত ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে ভারত বলছে, গঙ্গা চুক্তিসহ পানি ও নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলো দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা করা হবে। ফলে আগামী মাসগুলোতে জেআরসি ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


