বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও অন্যদের অনির্দিষ্টকাল বিনা বিচারে আটক রাখা বন্ধ করতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে কারাগারে আটক অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনাগুলোর স্বাধীন তদন্ত, নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার নীতি এবং ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করার আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর পুলিশ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থককে আটক করে। তাঁদের মধ্যে শত শত ব্যক্তি এখনো কারাগারে রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আনা হয়নি বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, শেখ হাসিনা সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন। তবে আন্দোলনকারীদের হত্যার অভিযোগে অনেককে দৃশ্যমান প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের বরাত দিয়ে তাঁরা বলেছে, তাঁদের অনেকে বয়স্ক এবং কেউ কেউ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। তাঁদের জামিন ও চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এইচআরডব্লিউয়ের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, এক সরকারের পর আরেক সরকারের আমলে কোনো প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটক রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সরকারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় ধরে খেয়ালখুশিমতো আটক রাখা বন্ধ করা উচিত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আটক রাখার প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির মতে, ট্রাইব্যুনাল এক বছরের বেশি সময় অভিযোগ ছাড়া কাউকে আটক রাখতে পারেন শুধু লিখিতভাবে উল্লেখ করা ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’।কিন্তু ট্রাইব্যুনাল যাঁদের আটক করেছেন, তাঁদের মধ্যে ১৬০ জনের বেশি ব্যক্তিকে এখন পর্যন্ত জামিন দেওয়া হয়নি। জামিন প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁদের আপিলের অধিকারও নেই বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
আটক ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না বলেও অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ও হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে না পারা ৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবিরকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে কিছু ক্ষেত্রে বিচার শুরুর আগে কাউকে আটক রাখা কিংবা নির্দিষ্ট শর্তে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিচার শুরুর আগে আটক রাখা ‘ব্যতিক্রম’ হওয়া উচিত, নিয়ম নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংস্থাটি বলেছে, আটক ব্যক্তির দ্রুত বিচারের অধিকার রয়েছে; দ্রুত বিচার সম্ভব না হলে তাঁকে মুক্তি দিতে হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির দাবি, সংস্কার ছাড়া বর্তমান রূপে বিলটি পাস হলে নতুন কমিশন কথিত খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না।
বিনা অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি, শেখ হাসিনা সরকারের সমর্থক, অন্যান্য দলের সাবেক আইন প্রণেতা, আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থনকারী সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিক রয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্যদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, গুম ও দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।


