ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ-রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই মহাসড়কে সম্প্রতি ডাকাতির ঘটনা ব্যাপক বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান অংশে রাত নামলেই চরম ডাকাত আতঙ্কে ভুগছেন বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা।
গাজীপুরের নির্জন গজারিবন এলাকায় প্রায় প্রতিদিন সংঘটিত হচ্ছে ডাকাতির ঘটনা। গত ৩০ আগস্ট রাতে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী একটি পিকআপ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ৩ নম্বর গেট এলাকা পার হওয়ার সময় রাস্তার ওপর থাকা মোটা রডে সামনের চাকা ফেটে যায়। চালক মো. মোমেন মিয়া (৩২) নিচে নামতেই পাঁচ-ছয়জনের ডাকাত দল গজারি বন থেকে বেরিয়ে এসে ধারালো অস্ত্রের মুখে তাঁর সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে। একপর্যায়ে তিনি পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলে পেছন থেকে আসা একটি গাড়ির চাপায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
এর আগে গত ১৯ আগস্ট রাতে একই মহাসড়কের ভাওয়াল উদ্যানের ৪ নম্বর গেট এলাকায় প্রাইভেট কার চালিয়ে কিশোরগঞ্জ ফেরার পথে চাকার ওপর রড দিয়ে আঘাত করে গাড়ি থামায় ডাকাতরা। পরে চালক মো. শহিদুল ইসলামকে দেশীয় অস্ত্রের মুখে অপহৃত করে জঙ্গলের ভেতরের এক টর্চার সেলে আটকে রেখে মারধর ও লুটপাট চালানো হয়। পরের দিন সকালে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করেন। ডাকাত দল তাঁর গাড়ি ও মোবাইল নিয়ে পালিয়ে যায় এবং ভোর সোয়া ৬টার দিকে ঢাকার পল্লবীর একটি ব্র্যাক ব্যাংক এটিএম বুথ থেকে তাঁর কার্ড ব্যবহার করে ২২ হাজার টাকা তুলে নেয়। পুলিশ দুই দিন পর বোর্ডবাজার এলাকা থেকে গাড়িটি পরিত্যক্ত উদ্ধার করে।
সন্ধ্যা নামার পর গাজীপুর মহানগরীর সদর থানার নান্দুয়ান থেকে রাজেন্দ্রপুর এলাকা এখন এক আতঙ্কের নাম। গজারিবনে লুকিয়ে থেকে ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা ঢিল, রড ও লোহা দিয়ে গাড়ি থামাতে বাধ্য করে সর্বস্ব লুটে নেয়। বাধা দিলে চলে বেধড়ক মারধর ও কুপিয়ে জখম। গত এপ্রিলে চার ব্যক্তিকে অপহরণ করে গজারিবনে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়, পরে পুলিশ গিয়ে গুলি ছুড়ে তাদের উদ্ধার করে। শ্রীপুরের শিক্ষক মো. মোতাহার হোসেনসহ স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, ডাকাতরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে খুনখারাবি করতেও দ্বিধা করছে না। তাঁরা পর্যাপ্ত সড়কবাতি, সিসি ক্যামেরা ও সার্বক্ষণিক পুলিশি টহলের দাবি জানিয়েছেন।
অবশ্য জয়দেবপুর থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন মাস্টারবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গত ২০ আগস্ট একটি নতুন পুলিশ ক্যাম্প উদ্বোধন করা হয়েছে। ৪টি মোটরসাইকেলসহ ৬টি টহল টিম, চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি ও সার্বক্ষণিক পাহারা চালুর ফলে ডাকাতি-ছিনতাই অনেকাংশে কমে এসেছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশেও ডাকাতির উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। রাত ১০টার পর থেকে নির্জন ও সংযোগ সড়কগুলোতে গাছের গুঁড়ি, লোহার রড, ইট-পাথর দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়। বিশেষ করে প্রবাসফেরত যাত্রী, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসকে লক্ষ্য বানিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে লুণ্ঠন চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, মহাসড়কের দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ডাকাত সদস্য ইলিয়টগঞ্জ, মাধাইয়া, চান্দিনা, নিমসার, ময়নামতি ও পদুয়ার বাজার এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছে। তারা রাতে গোপন বৈঠক করে ডাকাতির ছক কষে। পুলিশি ট্র্যাকিং এড়াতে তারা দেশীয় সিমের বদলে বিদেশি সিম ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে যোগাযোগ ও মিশন পরিচালনা করে।
পরিবহনসংশ্লিষ্টরা সড়কবাতি, সিসি ক্যামেরা ও ধারাবাহিক পুলিশি অভিযানের ওপর জোর দিয়েছেন। দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ওসি ইকবাল বাহার মজুমদার জানান, মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশের নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে এবং ডাকাতদের দেখলেই তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের অভিযান চালানো হচ্ছে।


