মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট ও বিশ্ববাজারে জ্বালানির চরম অস্থিরতায় বড় ধরনের আর্থিক চ চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো। ফলে সরকারের ভর্তুকির বোঝা লাগামহীনভাবে বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই এলএনজি খাতে সরকারের সার্বিক ভর্তুকি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়, যা পুরো অর্থবছরের জন্য রাখা মূল বরাদ্দের (৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) চেয়েও বেশি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় টালমাটাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দর অস্বাভাবিক বেড়েছে। একসময় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা গেলেও আগস্টে তা বেড়ে ১৮ থেকে ২২ ডলারে পৌঁছায়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের কার্গোগুলোর দর প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে চড়া দামের খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কিনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, গত ছয় মাসে চড়া দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রির কারণে বিপিসির লোকসান ২২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি এসে পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও। গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের প্রাক্কলন করা হলেও, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়তে থাকায় সংস্থাটির সার্বিক লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত মে মাস পর্যন্ত দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও তা আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যবধান পূরণে পর্যাপ্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিভিত্তিক জ্বালানি নীতির কারণেই আজ এ ধরনের সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ না নিলে এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।


