দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বা পে স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। তীব্র মূল্যস্ফীতির এই কঠিন সময়ে সিদ্ধান্তটি দেশের প্রায় ৩৩ লাখের বেশি সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জীবনে সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এলেও, রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে এক বিশাল আর্থিক সংকট। নতুন পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের রাজকোষ থেকে প্রতিবছর অতিরিক্ত খরচ হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের টাকার সংস্থান রাষ্ট্র কীভাবে করবে, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে মূল দুশ্চিন্তা।
অর্থনীতির ভাষায় এই ব্যয়ের পরিধি স্পষ্ট করতে বিশেষজ্ঞরা ঢাকার মেট্রোরেল ৬ (এমআরটি-৬) প্রকল্পের উদাহরণ টেনেছেন। বর্তমানে মেট্রোরেল-৬ প্রকল্পের মোট বাস্তবায়িত বা সংশোধিত ব্যয় প্রায় ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, নতুন পে স্কেলের জন্য প্রতিবছর যে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে, তা দিয়ে এক বছরেই তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের সম্পূর্ণ খরচ চালানো সম্ভব। তবে এটি কেবল একবারের মেগাপ্রকল্প ব্যয় নয়; বরং পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে ভবিষ্যতের বাজেটে বছরভিত্তিক এই বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থায়ী ব্যয় হিসেবে যুক্ত হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই বিশাল অঙ্কের নতুন আর্থিক দায় মেটাতে সরকারকে এক বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রজাতন্ত্রের জনগণের রক্তঘামে উপার্জিত বিপুল রাজস্ব থেকে অতিরিক্ত এই বেতন দেওয়ার বিনিময়ে নাগরিকদের কতটুকু উন্নত, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে? কেবল বেতন বাড়ানোই শেষ কথা নয়; বরং সরকারি কর্মচারীদের সেবার মানোন্নয়নে প্রশাসনিক সংস্কার ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের সঠিক কাঠামোর দরকার বলে তিনি সতর্ক করেন।
সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের সুফল পাবেন বিভিন্ন ব্যাচের প্রায় ২৪ লাখ সামরিক-অসামরিক কর্মী এবং সোয়া ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও সুবিধাভোগী। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৫৬,০০০ টাকা হচ্ছে।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ও সরকারের যুক্তি
হঠাৎ করে অর্থনীতির ওপর বিরাট ধাক্কা সামলাতে পুরো খরচ একবারে না বাড়িয়ে দুই অর্থবছরে (২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮) ধাপে ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সরকার। এতে মূল বেতন কার্যকর হবে তিন ধাপে, আর ভাতা ও বর্ধিত পেনশন কার্যকর করা হবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে। প্রশাসনের নীতি-নির্ধারকদের দাবি, কিস্তিতে বা ধাপে বাস্তবায়ন করার ফলে বাজারব্যবস্থা এবং জাতীয় মূল্যস্ফীতির ওপর আকস্মিক চাপ কম থাকবে।
রাজস্ব আদায়, ঋণ ও ক্রাউডিং আউট ঝুঁকি
২০২৬-২৭ অর্থবছরে যেখানে সরকারের সার্বিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, সেখানে কেবল নতুন পে স্কেলের বার্ষিক অতিরিক্ত খরচই দাঁড়িয়েছে ওই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৫.২ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এমনিতেই সন্তোষজনক নয়। এই ঘাটতির দরুন নতুন ১ লাখ কোটি টাকার বাড়তি স্থায়ী চাপ রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে কঠিন সীমানার মুখে ফেলবে।
রাজস্বের ঘাটতি থাকলে সরকারকে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা সামাজিক সুরক্ষার মতো জরুরি উন্নয়ন খাতের বাজেট কাটছাঁট করতে হতে পারে। দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে বাধ্য হবে সরকার, যার লক্ষ্য ইতিমধ্যেই চলতি বাজেটে রাখা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো থেকে সরকার যদি বেশি মাত্রায় ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে যাবে—যা অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বিনিয়োগ মন্দা হিসেবে চিহ্নিত। এতে ব্যবসা সম্প্রসারণ মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ভোগ বাড়ার সুযোগ ও পণ্যের দামে নতুন ঊর্ধ্বগতি
নতুন স্কেল চালুর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে টাকা আসায় বাজারে বস্ত্র, খাদ্য, পরিবহন, আবাসন ও চিকিৎসা সেবা খাতে খরচ বা ভোগ বাড়বে। ফলে বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের চাকা কিছুটা বেগবান হওয়ার এবং ভ্যাটের মাধ্যমে পরোক্ষ রাজস্ব সামান্য বাড়ার একটা সুযোগ রয়েছে। তবে উৎপাদন ও যোগানপ্রবাহ না বাড়িয়ে শুধু টাকার জোগান বাড়ালে তা পণ্যের দাম আরও বাড়াতে পারে, যার ফলে পে স্কেলের সুবিধা মূল্যস্ফীতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক সতর্ক করে জানান, সরকারি কর্মীদের পে স্কেলের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর সরকারি তদারকি জরুরি। বড় পাইকারি বাজারের সিন্ডিকেট বা মধ্যস্বত্বভোগীদের অবৈধ লেনদেন সামলানো এবং গ্যাস, বিদ্যুৎসহ পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সরকার যেখানে কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা তৈরি এবং জনবান্ধব প্রশাসন উপহার দিতে পে স্কেল অনুমোদনকে বড় অর্জন ভাবছে; অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—বাস্তবতা এখন ভিন্ন। প্রতিবছর ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার নতুন দায়ের কঠিন উৎসটি খুঁজে বের করাই এখন বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


