নেপাল ও তিব্বতে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭ হয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৭৮১ জন ও তিব্বতে ১৬ জন মারা গেছে। নেপালে এখনো দুই হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ। সেখানে সাত হাজার ৫১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এদিকে চীনের তিব্বতে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছে বলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিব্বতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশিরাও রয়েছেন।
বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারীরা অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় সরে গেছেন। খারাপ আবহাওয়া এবং নেপাল-চীন সীমান্তে কাদাধসের পর সৃষ্ট একটি হ্রদ নিয়ে উদ্বেগের কারণে গত শুক্রবার থেকে কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান স্থগিতও করা হয়েছে। গত বুধবার একটি হিমবাহধসের পর পাথর, মাটি ও কাদা জমে নদীর গতিপথ আটকে ওই হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার থেকে হ্রদের পানি উপচে নেপালের নদীগুলোতে প্রবেশ করতে শুরু করায় এটি নতুন করে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেয়ালে সাঁটানো মুখগুলো আর ফিরবে না : নেপালের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো নিখোঁজ মানুষের সারি সারি ছবি। কোথাও স্কুলের ইউনিফর্ম পরা এক কিশোরী, মুখে হাসি। কোথাও গোলগাল গালের এক শিশুর ছবি। বিয়ের দিনের হাসিমুখের এক দম্পতি, পাশেই পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ কিংবা দরজার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া লম্বা চুলের এক কিশোরী। কেউ জানে না ছবির মানুষগুলো কোথায়।কেউ জানে না তারা বেঁচে আছে কি না! হিমবাহধসের কারণে প্রলয়ংকরী ঢলে পুরো গ্রাম ভাসিয়ে নেওয়ার পর নিখোঁজ হাজারো মানুষের স্বজন এখন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছেন। রোগীদের তালিকায় পরিচিত কোনো নাম খুঁজছেন, পুলিশ ডেস্কে নিখোঁজ স্বজনের নাম লিখিয়ে দিচ্ছেন আর দেয়ালে সাঁটিয়ে দিচ্ছেন প্রিয় মানুষের ছবি।
নেপালের চিতওয়ান শহরে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে মর্গগুলো। মৃতদেহ রাখার জন্য তৈরি করতে হয়েছে অস্থায়ী ভবন। প্রবল স্রোতে কিছু মরদেহ এত দূরে ভেসে গেছে যে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে প্রতিবেশী ভারত থেকে। কাদামাটির নিচে আরো কত মানুষ যে চাপা পড়ে আছে, তা কেউ বলতে পারছেন না। বলতে পারছেন না উদ্ধারকারীরাও। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করাও হয়ে উঠেছে এখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। দুর্যোগ আঘাত হানার চার দিন পরও রাজধানী কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে স্বজনদের ভিড় কমেনি। পুলিশ ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক মানুষ পরিবারের নিখোঁজ সদস্যদের নাম নিবন্ধন করছেন। প্রিয়জনরা বেঁচে আছেন—এ আশায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শত শত আহত ব্যক্তির তালিকায় চোখ বুলিয়ে কেউ খুঁজছেন বাবা, কেউ সন্তান, কেউ স্বামী কিংবা ভাইকে।
আরেকটি হড়পা বানের আশঙ্কা বাড়ছে : হিমবাহধসে গত বুধবার নেপাল ও তিব্বতের কিছু এলাকায় কাদামাটির প্রলয়ংকরী পাহাড়ি ঢল নেমে আসার দুই দিন পর ওই এলাকায় নতুন করে আবার ভয়াবহ ঢল নামার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কারণ হিমবাহধসের পর ওই এলাকায় নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। ওই হ্রদের পানি গত শুক্রবার থেকে উপচে পড়তে শুরু করেছে। এ ঘটনায় ওই অঞ্চলে প্রচণ্ড আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
রাসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে।’ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুর্যোগের কারণে একটি নয়, বরং দুটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। একটি হিমবাহের কাছাকাছি উঁচু এলাকায় তৈরি হয়েছে, যেখানে হিমবাহ গলা পানি এখন আটকে আছে। অন্যটি আকারে অনেক বড় ও বেশি বিপজ্জনক। এই হ্রদ নেপালের একটি নদীর ওপর তৈরি হয়েছে। সেখানে বড় আকারের ভূমিধসে উপত্যকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে নদীর পানি আটকে ওই হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। দ্য কাঠমাণ্ডু পোস্ট জানিয়েছে, হ্রদটি ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই দুই নদীর পানি দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে কাঠমাণ্ডুর দিকে যায়।
তিন দিন পর জীবিত উদ্ধার ৬ বছরের শিশু : নেপালের রসুয়া জেলায় বিধ্বংসী বন্যার তিন দিন পর উদ্ধারকারীরা কাদা আর ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে ছয় বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। স্থানীয় শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে রসুয়া জেলায় বন্যার ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে ওই শিশুকে উদ্ধার করা হয়। বন্যার ধ্বংসাবশেষের নিচে শিশুটির কান্নার শব্দ শুনতে পান উদ্ধারকারীরা।
টিকটকে নিখোঁজ মা-মাসির অবস্থান শনাক্ত : নেপালে নিখোঁজ এক নারীর মেয়ে জানিয়েছেন, প্রলয়ংকরী পাহাড়ি ঢল আঘাত হানার কয়েক ঘণ্টা আগে টিকটকে পোস্ট করা একটি ভিডিও দেখে তিনি তাঁর মায়ের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত করেছেন। টিকটক ভিডিওর মাধ্যমে মায়ের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত করা নারীর নাম তুলসী প্যাটেল। তাঁর মা হেমাঙ্গিনী জিতেন্দ্র প্যাটেল ও তাঁর মাসি হেমা সুনীল আমিন তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল তিব্বতে যাওয়ার। কিন্তু পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধস আঘাত হানার পর তাঁদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে করুণ ব্যাপার হলো মা-মাসির নিখোঁজের স্পটে এখন উদ্ধার তৎপরতা চালানোর কোনো পরিবেশ নেই।


