দেশে পারিবারিক সহিংসতা ও একসঙ্গে একাধিক মানুষ খুনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। রংপুর, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর পর কয়েকটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের খবর এসেছে। অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ধরনের অপরাধ মানুষের মনে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করছে।
গত জুনে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এক যুবক ঘরে ঢুকে মা ও তাঁর তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করেন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন শাহিনুর বেগম এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার, ইকরা ও সিপা। অভিযুক্ত যুবক অন্তর মারাত্মক মাদকাসক্ত ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, মাদকের টাকার জন্য তিনি এই নৃশংস ঘটনা ঘটান। পালানোর সময় উত্তেজিত জনতার পিটুনিতে অভিযুক্ত অন্তরও মারা যান।
অনুরূপ এক নৃশংস ঘটনা ঘটে রংপুরের মাছুয়াপাড়ায়। সেখানে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছাদের ওপর মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশ দাবি করছে।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার অন্তত ১৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন মোট ৪৭ জন। কোনো ঘটনায় একই পরিবারের দুজন, আবার কোনোটিতে তিন, চার বা পাঁচজন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন। এই ১৮টি ঘটনার মধ্যে মে ও আগস্ট মাসের প্রথম ২৪ দিনেই ঘটেছে ১০টি ঘটনা। এর ফলে ২৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধানত জমি সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ ও মাদকাসক্তি দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে বেকারত্ব ও মানসিক হতাশাও অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। যেমন চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বেকার ও মাদকাসক্ত ছেলে রিমন তাঁর বাবা স্বপন দাশ গুপ্ত ও মা কল্পনা দাশ গুপ্তকে কুপিয়ে হত্যা করেন।
অপরাধ সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও মামলার দীর্ঘসূত্রতা মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে মাদক খুব সহজেই হাতের কাছে চলে আসছে। ফলে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে এবং হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অপরাধীরা নিজের ঘরেই স্বজনদের হত্যা করছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে সার্বিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে মোট হত্যা মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি। গত ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, মানুষ যখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও নিরাপদ বোধ করে, তখনই প্রকৃত আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। আবাসন বা ঘরের ভেতরের অপরাধগুলো বন্ধ করতে পুলিশ শুধু আসামি গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করার ওপর জোর দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষক তৌহিদুল হক মনে করেন, পারিবারিক বিরোধ ও সম্পদ নিয়ে টানাপোড়েন দীর্ঘদিন ধরে সমাজে রয়েছে। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও অপরাধের দ্রুত বিচার না হলে এই সহিংসতা থামানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সব নাগরিক ঘরে ও বাইরে নিরাপদ বোধ করবেন।


