রাজধানীর শ্যামলী স্কয়ারের একটি গয়নার দোকান ফেসবুকে মাত্র ৪,৯৯৯ টাকায় ডায়মন্ডের নাকফুল বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। কমেন্ট সেকশনে এক ক্রেতা ভীতি প্রকাশ করেছেন। দোকান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তাদের হীরা ১০০% প্রাকৃতিক এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সংগৃহীত। দেশের সর্বত্র শত শত প্রতিষ্ঠান এভাবে হীরার গয়না বিক্রি করছে।
বাংলাদেশে হীরার খনি বা উৎপাদন নেই। ২০১৮ সালের পর থেকে বৈধ আমদানিও বন্ধ রয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও দেশে হীরা আমদানির পরিমাণ ছিল শূন্য। অথচ ব্যবসায়ীদের হিসাবে দেশে হীরার গয়নার বাজার এখন ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বাংলাদেশে হীরার বাজারের বড় অংশই অবৈধ চোরাচালানের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে ল্যাবে তৈরি নকল হীরায় বাজার ছেয়ে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এত কম দামে আসল হীরার গয়না বিক্রি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বর্তমানে ০.২ গ্রাম হীরার দাম ৮৩ হাজার টাকার বেশি।
গত ২ এপ্রিল যশোরে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার হীরাসহ তামিলনাড়ুর এক নাগরিককে আটক করা হয়। গত বছরের ৩০ জানুয়ারি যশোরের সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের হীরার গয়নাসহ এক পাচারকারীকে আটক করে বিজিবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধভাবে আসা হীরার বেশির ভাগ চালান অধরাই থেকে যাচ্ছে।
২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হীরা থেকে মোট রপ্তানি আয় ছিল প্রায় তিন কোটি ৯৬ লাখ ডলার। ২০০৩ থেকে ২০১৮ সালে ৯৩.৫ লাখ ডলারের হীরা আমদানি হয়। ২০১৮ সালের পর আর বৈধভাবে হীরা কিংবা হীরার গয়না আমদানির রেকর্ড নেই। গত আট বছরে বৈধভাবে হীরা আমদানি হয়েছে ১০ লাখ টাকার কম মূল্যের। তা এসেছে শুধু শিল্প খাতের জন্য।
২০১৯ সাল থেকে বাজারে হীরার চাহিদা ও দোকান বাড়তে থাকে। বন্ড সুবিধা ছাড়া অমসৃণ হীরায় কর প্রায় ৮৯ শতাংশ। মসৃণ হীরায় কর প্রায় ১৫১ শতাংশ। এই উচ্চ শুল্কই অবৈধ পথের প্রধান কারণ।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ কোটি টাকার হীরা অবৈধভাবে ঢোকে। বছরে তা প্রায় ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। সোনাসহ মোট চোরাচালানের পরিমাণ বছরে ৯১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়।
ভারতের সুরাট বিশ্বের সবচেয়ে বড় হীরা পলিশিং কেন্দ্র। সেখান থেকে সীমান্ত দিয়ে হীরা দেশে আসে বলে ধারণা করা হয়।
আসল হীরার পাশাপাশি মোজানাইট ও জারকনসহ ল্যাবে তৈরি নকল হীরা আসলের নামে বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাংলামোটরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ল্যাব এসজিএল হীরা পরীক্ষা করে আসল ও নকল শনাক্ত করছে।
সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির কেন্দ্রে রয়েছে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও এর মালিক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। সিআইডি ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁর বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলা করেছে। ভ্যাট ফাঁকি ও নকল হীরা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি বনানী থানায় এনজে ডায়মন্ডসের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুই নারী কর্মচারী আসল ডায়মন্ডের পরিবর্তে রেপ্লিকা অলংকার প্রতিস্থাপন করে চুরি করেছেন। আদালত তাঁদের পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন। এই চক্রটি ভারত ও দুবাই থেকে হীরা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।
ভারতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল। দেশে এখন ছোট আকারের পলিশিং কারখানা সীমিত। শুল্ক কমানো ও নীতি-সহায়তা পেলে এই খাতের রপ্তানি সম্ভাবনা অনেক।
চোরাচালান ও আটক পণ্য নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করেছে। নতুন নির্দেশনায় মূল্যবান পণ্যের জন্য স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন বলেন, বৈধ পথে আমদানি না থাকা সত্ত্বেও বাজারে পণ্য থাকা ব্যাবসায়িক সততার বড় বাধা। বাজারে নজরদারি বাড়ানো দরকার। বর্তমানে স্বর্ণ ও হীরার বাজার একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে কেনাকাটা অনেক কমে গেছে।


