দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় কোল্ড স্টোরেজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের এয়ার ফ্লো মেশিন নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না।
ফলে একদিকে জেনারেটর চালাতে বাড়ছে ডিজেল ব্যয়, অন্যদিকে পেঁয়াজ, আলু ও বীজ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও এসব পণ্য নষ্ট হতেও শুরু করেছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—তিন পক্ষের ওপরই।
দেশের হিমাগারগুলোর ৮০-৯০ শতাংশ স্থান আলু সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। এর বাইরে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, সবজি, ফল, বীজ, হিমায়িত মাছ-মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যও সংরক্ষণ করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব কৃষিপণ্যের বড় একটি অংশেই পড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আলু সংরক্ষণের জন্য ৩৫১টি কোল্ড স্টোরেজ সক্রিয় রয়েছে। এসব হিমাগারে প্রায় ২৬ লাখ টন আলু মজুদ আছে। দেশের বিভিন্ন কোল্ড স্টোরেজে কয়েক হাজার টন পেঁয়াজও সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটে এসব মজুদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর বাইরে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চিংড়ি শিল্পের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতও ব্যাহত হচ্ছে। চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কোল্ড স্টোরেজ সচল রাখতে ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমের ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হিমাগারেও একই চিত্র। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে কুমিল্লা, জয়পুরহাট ও রাজশাহীর হিমাগারে আলু ও বীজ সংরক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। জয়পুরহাটের আর বি কোল্ড স্টোরেজে দিনে ৬ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হওয়ায় মাসে ১৫ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা।
জয়পুরহাটের কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, ‘হিমাগারে আলু রাখতে এখন বিদ্যুৎই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, এতে সংরক্ষণ খরচ বাড়ছে। এ বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত কৃষকের ওপরই চাপবে।’
রংপুর বিভাগের হিমাগার মালিকরাও বিদ্যুৎ সংকটে বিপাকে পড়েছেন। এ বিভাগের আট জেলায় প্রায় ৮০টি হিমাগার রয়েছে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘দুই মাস ধরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় আলু সংরক্ষণে হিমাগার মালিকদের ব্যয় বেড়েছে। সরকারি বিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে যেখানে প্রায় ১৮ টাকা খরচ হয়, সেখানে জেনারেটরে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে ৪০-৪৫ টাকা।’
তিনি আরো জানান, তার মালিকানাধীন নীলফামারীর দুটি হিমাগারে এখনো প্রায় এক হাজার টন বীজ আলু রয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটে প্রতিদিন আগের বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বীজ
আলুর গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হিমাগারে আলু সংরক্ষণে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ না থাকায় তা ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে বীজ আলুর পাশাপাশি খাবার আলুর মানও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও চাষী কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘কোল্ড স্টোরেজে প্রতিদিন ১৫-১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে প্রতিদিন ২৫-৩০ হাজার টাকা ডিজেল খরচ করে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।’ তিনি জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না পেলে আলু পচে না গেলেও অঙ্কুরোদ্গমসহ গুণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাট নয়, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিও হিমাগার খাতের ব্যয় বাড়িয়েছে। রংপুরের ফয়জুন নাহার হিমাগারে এক মাসের বিদ্যুৎ বিল ১০ লাখ ৪৬ হাজার থেকে বেড়ে ১২ লাখ ৫ হাজার ৫৫১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ও ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়ায় পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন হিমাগার মালিকরা। অথচ বাজারে আলুর ন্যায্যমূল্য না থাকায় এ বাড়তি ব্যয় কৃষকের ওপর চাপানোও কঠিন।
পেঁয়াজের ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কৃষকের লোকসান কাটছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১০০ টন। প্রধান উৎপাদন এলাকাগুলোতে ফলন বাড়লেও অতিরিক্ত সরবরাহে মৌসুমে দাম কমে যায়। সংরক্ষণ করে পরে বিক্রির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
পাবনার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এবার পেঁয়াজের ফলন ভালো হলেও দাম কম থাকায় আমরা বিপাকে পড়েছি। সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করতে চাই, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় এয়ার ফ্লো মেশিন ঠিকমতো চালাতে পারছি না। পেঁয়াজ নষ্ট হলে লোকসান আরো বাড়বে।’
বিদ্যুৎ সংকটে ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ ও মেহেরপুরে এয়ার ফ্লো মেশিন নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয়ে পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। জুলাইয়ে ফরিদপুর ও রাজবাড়ীতে প্রতি মণ পেঁয়াজের দাম ৭৫০-৯০০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫০০-১ হাজার ৭০০ টাকায় ওঠে। পচন, অতিবৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত সংরক্ষণের কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে।
যদিও বিদ্যুৎ সমস্যা সাময়িক উল্লেখ করে তা সমাধানে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সচিব সেলিম খান। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, কৃষিপণ্য নিয়ে কৃষকের কোনো ক্ষতি হোক অথবা ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হোক। এখন যে বিদ্যুতের সমস্যার এটা সাময়িক সমস্যা। সরকার এ সমস্যা সমাধানের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আশা করি, এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা এখনো পর্যন্ত সমস্যাটি নিয়ে আমাদের কাছে আসেননি। তারা যদি আমাদের কাছে সমস্যাটি নিয়ে আসেন, তাহলে তাদের সমস্যার ধরন কী, তাদের সমস্যাটা কী এবং তাদের চাওয়াটা কী—এসব শুনে আমরা সেভাবেই ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করব এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’
অন্যদিকে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নতির আশা করছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। গতকাল পরিকল্পনা কমিশনে একনেক সভার পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ অপর্যাপ্ত থাকায় বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, স্থানীয় গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিয়ে সরকার কাজ করছে। দ্রুতই বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংকটে কৃষির উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য কোল্ড স্টোরেজে রাখতে না পারলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষক। এ ক্ষতি দীর্ঘায়িত হলে কৃষক উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারেন, যা খাদ্যমূল্য ও খাদ্যনিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই কৃষি খাতের প্রয়োজনীয় কলকারখানা ও কোল্ড স্টোরেজে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।’


