জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের নেতাদের অংশগ্রহণের পথ বন্ধ করতে চায় জামায়াতে ইসলামী। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে প্রস্তাব দিয়েছে তারা। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের এই চাওয়া বাস্তবায়ন করতে হলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা–অযোগ্যতাসংক্রান্ত আইন বা বিধিমালায় সংশোধনী আনতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ইসি দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আচরণবিধির খসড়া প্রস্তুত করে তার ওপর দলগুলোর মতামত চেয়েছে ইসি। জামায়াত তাদের মতামত জানিয়ে দেওয়া চিঠিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদের কাছে এই মতামত পাঠিয়েছে দলটি।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। কোনো দলের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতো দলীয় প্রতীকে। বর্তমান সরকার আইনটি সংশোধন করেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ। সরকার ও ইসি সূত্র জানায়, আগামী অক্টোবরে স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তরে নির্বাচন করতে চায় ইসি। আগস্টের শেষে বা সেপ্টেম্বরে এসব নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
ইসি ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতসহ অন্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে ইসিতে নানা সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এসব প্রস্তাব ধরে এখনো ইসি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার মতো আইনি ভিত্তি এখন নেই। এটি করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা–অযোগ্যতা সম্পর্কিত যেসব ধারা আছে, সেগুলোর সংশোধনী আনতে হবে। অথবা নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালায় সংশোধন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো কী চায়, তা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে বিএনপি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নেতারা যাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে না পারেন, সেই দাবি করেছিল গণ অধিকার পরিষদ। তখন ইসি জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে এ ধরনের কোনো সংশোধনী আনার প্রস্তাব করেনি। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় একটি হলফনামা দেওয়ার বিধান করা হয়েছিল। যেখানে প্রার্থীকে হলফ করে বলতে হয়েছিল যে তিনি কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। গতকাল শনিবার বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ এবং নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দুজনই জানান, জামায়াতের চিঠি বা প্রস্তাবের বিষয়ে তাঁদের কিছু জানা নেই।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হবে। এ ক্ষেত্রে ঋণখেলাপি, বিলখেলাপি কিংবা সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছাড়া কাউকে তো নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা যায় না। কোন আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্বাচনের বাইরে রাখা হবে? অনেকের ১০ বছর ধরে পদ আছে। কেউ কেউ অতীতে পদে ছিলেন, এখন নেই। বিষয়টি এত সহজ নয়।
জামায়াত যা চাইছে
জামায়াত ইসিকে দেওয়া চিঠিতে বলেছে, সরকারের পক্ষ থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত কোনো দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা-কর্মীকে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। এ বিধান সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে যুক্ত করার আহ্বান দলটির। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রশাসনে নিয়োগ পাওয়া প্রশাসক বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান আচরণবিধিতে সংযোজনের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ political কার্যক্রমের অংশ। তাই কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় তাদের (আওয়ামী লীগ) স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকারে নিয়োগ করা প্রশাসকেরা বিএনপির রাজনীতিতে সম্পয়ৃক্ত। তাঁদের অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। তাই ইসির কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাঁদের যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া না হয়।
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরের বছর দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যাবতীয় কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর ইসি আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করায় গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি।
গত ১৫ জুন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, কেউ বলছেন, এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে, কেউ বলছেন পারবে না। কেউ বলছেন, দলীয় প্রতীকে হবে না বলে ‘ক্লিন ইমেজের’ যাঁরা আছেন, তাঁরা অংশ নিতে পারবেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করলে সবার বুঝতে সুবিধা হতো। জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল সরকার নির্বাচন নিয়ে কথা বললেও আওয়ামী লীগের নেতাদের অংশ নিতে পারার বিষয়টি স্পষ্ট করেননি।
জামায়াতের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য সাংগঠনিকভাবে আবার সক্রিয় হওয়ার একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতারা দলীয় প্রতীক ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলে স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের উপস্থিতি আবারও দৃশ্যমান হতে পারে। তাই জামায়াত ইসিকে এমন প্রস্তাব দিয়েছে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অপরাধে যুক্ত নন কিংবা যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, এমন কাউকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা কতটা যৌক্তিক? ফলে সব রাজনৈতিক দল মিলে এ বিষয়ে একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


