Homeআন্তর্জাতিকনেপালে দ্বিতীয় দফা বন্যার ‘উচ্চঝুঁকির’ দিকে সতর্ক দৃষ্টি

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৭৫
নেপালে দ্বিতীয় দফা বন্যার ‘উচ্চঝুঁকির’ দিকে সতর্ক দৃষ্টি

নেপালে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধকতা ঠেলে একদিকে যেমন চলছে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ তৎপরতা, তেমনি প্রায় আড়াই হাজার নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য পেতে অধীর অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষীরা। দ্বিতীয় দফা বন্যার ‘উচ্চুঝুঁকির’ দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে, যদিও এই শঙ্কা আগের চেয়ে কম বলে জানিয়েছে সরকার।

নেপালে আকস্মিক ভূমিধস-বন্যায় বিপুল পরিমাণ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে।

আকস্মিক ভয়াবহ ভূমিধস-বন্যায় চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে জীবিত কেউ উদ্ধার হলে তা প্রতীক্ষারত স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে অনাবিল আনন্দ। এমন এক আনন্দের ঘটনা ঘটেছে ৯৭ বছরের এক বৃদ্ধাকে উদ্ধারের পর। গুনা মায়া বোহারা নামের ওই নারীকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের পর তাঁর প্রপৌত্র দীপক বোহারা বিবিসিকে বলেন, তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসা ‘এক যোদ্ধা’।

এদিকে লাশের মিছিল থেমে নেই। ভূমিধস-বন্যায় মৃতের সংখ্যা এর মধ্যে ৬২৬ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। নেপালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল গতকাল বলেন, এই মুহূর্তে সরকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং জরুরি ত্রাণ সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত চার হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা : পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, চিকিৎসক দল ও জরুরি সহায়তাকারীদের নিয়ে উদ্ধারকারী দল দুর্গত এলাকায় জীবিতদের অবস্থান নির্ণয়ে কাজ করছে। নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের খোঁজ পেলে তাঁদের পরিবার ও কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে কর্তৃপক্ষ।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ তৎপরতায় হেলিকপ্টার ছাড়া যাওয়ার উপায় নেই।তবে এসব এলাকায় অবতরণের ক্ষেত্রগুলো এখন জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য হেলিকপ্টার নামার সুযোগও নেই। ত্রাণসামগ্রী ফেলতে হচ্ছে ওপর থেকে।

একটি দাতব্য সংস্থার ভাষ্য, ভেঙে পড়া সড়ক ও সেতু দুর্যোগকবলিত এলাকায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিরাট বাধা সৃষ্টি করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস হওয়ায় আলো-বাতাস পাওয়ার সুযোগও বন্ধ।

কেয়ার বলেছে, ইলেকট্রনিকসামগ্রী চার্জ করার জন্য সোলার প্যানেল, ত্রিপল ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ শত শত জরুরি সহায়তা কিট দুর্গত এলাকায় বিতরণে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক প্যাকেজ নেপালি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরও করা হয়েছে। নেপাল সেনারা এসব ত্রাণসামগ্রী দুর্গত এলাকায় নিয়ে যাচ্ছেন।

নেপালের এক কর্মকর্তা জানান, মর্গগুলোতে এখনো দ্রুতগতিতে একের পর এক লাশ আসছে। গন্ধকি প্রদেশের কাসকির প্রধান জেলা কর্মকর্তা কুমান সিং গুরাং রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন স্থান থেকে অবিরাম লাশ গ্রহণ করছি। ৯টি এসেছে তানাহুন জেলা থেকে, ২৭টি নাওয়ালপারাসি পূর্ব জেলা থেকে এবং ২০টি ধানদিং জেলা থেকে।’ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৬৭৫ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানান তিনি।

চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, রাস্তাঘাটের ভয়ানক দুরবস্থা এবং যোগাযোগব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়ার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এর পরও গতকাল সকালে বৃষ্টির মধ্যে উদ্ধারকর্মীদের কাজ করতে দেখা গেছে। গতকাল চীনে প্রায় ৫০০ গ্রামবাসী ও নির্মাণকর্মী এবং ৫৫৫ জন পর্যটককে দুর্গত এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। চীনের অংশে এখনো ৫৫৪ জন নিখোঁজ। মৃতের সংখ্যা সাত।

দ্বিতীয় দফা বন্যার উচ্চ ঝুঁকি : নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল গতকাল বলেন, দ্বিতীয় দফা বন্যার ‘উচ্চ ঝুঁকির’ দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে। গতকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, যা তিন দিন পর্যন্ত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টির কারণে আবার কোনো বিপত্তি ঘটে কি না, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।

বন্যা-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার উজানে সৃষ্ট দুটি হ্রদের (যা ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট বাঁধের কারণে তৈরি হয়েছে) ওপর নেপাল নজর রাখছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে যে হ্রদ দুটির পানি পুরোপুরি নিষ্কাশিত না হওয়া পর্যন্ত বন্যার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, দ্বিতীয় হ্রদটির আকার বাড়ছে এবং এর পানি বের হওয়ার কোনো দৃশ্যমান পথ নেই; ফলে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, দেশটির পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী প্রথম হ্রদটির আকার কমছে। তবে চীনের একজন ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, হ্রদটি অস্থিতিশীল হতে পারে এবং ওই এলাকায় ছড়িয়ে থাকা শতাধিক হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদও ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, হিমবাহের ধ্বংসাবশেষ থেকে সৃষ্ট হ্রদটি ভাটির দিকের উদ্ধারকাজকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। যেহেতু পানি প্রাকৃতিকভাবেই বেরিয়ে যাচ্ছে, তাই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পানির প্রবাহ যদি কম বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকে এবং দুই-তিন দিনের মধ্যে তা পুরোপুরি নেমে যায়, তবে ভাটির দিকে উদ্ধারকাজ নিরাপদে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

চীনের সিসিটিভি বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, হ্রদটিতে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে উদ্ধারকর্মীদের দ্রুত সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হবে এবং অন্তত ৩০ মিনিট আগেই সেই সতর্কবার্তা দেওয়া হবে।

গত শুক্রবার হ্রদ থেকে পানি উপচে পড়ার কারণে উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পরে পর্যালোচনায় ঝুঁকিটিকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে করা হয়।

ক্ষতি কাটাতে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে : নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে গতকাল রয়টার্সকে বলেছেন, চলতি সপ্তাহে আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যার পর পুনর্গঠন কাজের জন্য নেপালের চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন (৪০০ থেকে ৫০০ কোটি) মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই অর্থের পরিমাণ দেশটির মোট অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান।

ওয়াগলে বলেন, ‘প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই খরচ চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এটি শুধুই একটি প্রাক্কলন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের সময় যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল, এবার তার চেয়ে অনেক কম অর্থের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে।’ 

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য