রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই উৎসবে মেতে ওঠেন স্পেনের ফুটবলাররা। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছে লা ফুরিয়া রোজা। গত রাতে নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ১,০ গোলে হারিয়েছে স্পেন। ২০১০ সালের পর ফের বিশ্বকাপ ঘরে তুলল স্প্যানিশরা। বিশ্বকাপ শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার পর স্পেনের ফুটবলাররা একে একে লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এলেন।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপ খেলতে এলে ট্রফি জেতা যায় না, এই মিথটা গতকালও টিকে রইল। অতীতে কেউ পারেনি, আর্জেন্টিনাও পারেনি। অধিনায়ক হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ কেউ জিততে পারেনি, লিওনেল মেসিও পারেননি। তবে মেসি একটি রেকর্ড গড়েছেন ফাইনাল খেলেই। তিনটি ফাইনালে অধিনায়কত্ব করেছেন আর্জেন্টাইন তারকা, যে রেকর্ড নেই অন্য কারও। তবে গোল্ডেন বুট জেতা হলো না মেসির। কিলিয়ান এমবাপ্পে ১০টি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো এই বুট জয় করলেন। নতুন মাইলফলক স্থাপন করলেন, দুবার এই ট্রফি জয়ের রেকর্ড নেই অন্য কারও।
প্রথমার্ধে স্প্যানিশ আর্মাডার আধিপত্য
গতকাল ফাইনালের প্রথমার্ধ শেষ হয় স্প্যানিশ আধিপত্যে। একসময় যেমন স্প্যানিশ আর্মাডা আধিপত্য দেখাত আটলান্টিক কোস্টে, ঠিক তেমনি। গত রাতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি নিষ্প্রভ ছিল। প্রথমার্ধে একবারও যুতসই কোনো আক্রমণ করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। বিপরীতে স্পেন অন্তত তিনবার অন টার্গেটে শট নিয়েছে। অবশ্য স্পেন আক্রমণে যতটা ভালো করেছে প্রথমার্ধে ডিফেন্ডিংয়ে ততটাই ভালো করেছে আর্জেন্টিনা। প্রবল স্রোতের মতো ধেয়ে আসা স্প্যানিশ আক্রমণগুলো রুখে দিয়েছেন ওতামেন্দি, ট্যাগলিয়াফিকো, রোমেরোরা। বাকিগুলো রুখে দিয়েছেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। প্রথমার্ধের বিরতিতে মেটলাইফের দর্শকরা মনোমুগ্ধকর এক অনুষ্ঠান দেখেন, সেখানে শাকিরা, জাস্টিন বিবার এবং বিটিএস পারফর্ম করেন। মিউজিকের তালে তালে ফাইনালের উন্মাদনা যেন বেড়ে যায় বহুগুণে।
১০ জনের আর্জেন্টিনা ও এমিলিয়ানোর অবিশ্বাস্য লড়াই
দ্বিতীয়ার্ধে খেলতে নেমে বল দখলের লড়াইয়ে কিছুটা ফিরলেও আক্রমণে ফিরতে পারেনি আর্জেন্টিনা। স্পেনের গোলমুখে প্রথম শট নেওয়ার অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছিল না আলবেসিলেস্তদের! অন্যদিকে লামিনে ইয়ামাল, কুবারসি, ওয়াইয়ারজাবাল, কুকুরেয়ারা একের পর এক আক্রমণ করেই যাচ্ছিলেন। স্পেনের গতি আর টিকিটাকা কৌশল বারবারই ভেঙে দিচ্ছিল আর্জেন্টিনার ডিফেন্স লাইন। দারুণ সব সুযোগ তৈরি করছিলেন ইয়ামালরা, সেসব বারবারই আটকে যাচ্ছিল। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১৪ বার আর্জেন্টিনার গোলমুখে আক্রমণ করে ৯ বারই অন টার্গেটে শট রাখে স্পেন, তারপরও গোলের দেখা পায়নি তারা। অন্যদিকে তখনো আর্জেন্টিনা প্রথম শটই নিতে পারেনি।
যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের পর লাল কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। কুবারসির পায়ে আঘাত করায় মাঠ ছাড়তে হয় তাকে, ১০ জনের দল নিয়ে খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের নির্ধারিত সময়ে ১০টি সেভ করে ইতিহাস গড়েন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক, বিশ্বকাপ ফাইনালে কোনো গোলরক্ষকই এতগুলো সেভ করতে পারেননি এর আগে। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে খেলতে নেমে নিকো উইলিয়ামসের হেডে বল ছুটে যাচ্ছিল জালের দিকে, পাখির মতো উড়ে গিয়ে সেই বল ফিরিয়ে দেন এমি মার্টিনেজ, যাকে আর্জেন্টাইনরা দিবু বলে ডাকে।
৯৬ মিনিটে স্পেন একটা গোল করে, তবে বল জাল স্পর্শ করার আগেই ফাউল করেন মেরিনো, গোলটা এ কারণে বাতিল করেন রেফারি। অবশ্য অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যায় স্পেন। নিকো উইলিয়ামসের অ্যাসিস্টে গোলটা করেন তিনি। ১২টা গোল বাঁচানোর পর পরাস্ত হন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। এরপর ফেরান তোরেস আরও একটা গোল করেছিলেন, তবে অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়।
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়
গতকাল শুধু একটি ট্রফির লড়াই ছিল না, এ লড়াই ছিল ৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসের আরেকটি নতুন অধ্যায়। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে শুরু হয়েছিল ফুটবল বিশ্বকাপের যাত্রা, প্রথম শিরোপা জিতেছিল স্বাগতিক উরুগুয়ে। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক শতাব্দী, বদলেছে ফুটবল, বদলেছে কৌশল, বদলেছে নায়ক। কিন্তু বিশ্বকাপের আবেদন একটুও কমেনি, বরং দিনে দিনে বেড়েছে দলের সংখ্যা। পৃথিবীর প্রায় সবাইকেই ফুটবলের সুতোয় বেঁধেছে বিশ্বকাপ।
ফুটবলের এ বিশ্ব আসরে এ পর্যন্ত সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল, সেলেসাও খ্যাত দলটি পাঁচবার বিশ্বকাপ জয় করেছে (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২)। জার্মানি ও ইতালি চারবার করে শিরোপা জিতেছে। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয় করেছে তিনবার। দুবার করে বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্স ও উরুগুয়ের পাশে স্থান নিয়েছে স্পেনও। ইংল্যান্ডেরও আছে একটি বিশ্বকাপ শিরোপা।
এবারের বিশ্বকাপে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করেছেন লামিনে ইয়ামাল, জুড বেলিংহাম, আরলিং হলান্ডদের মতো তারকারা। ফুটবল যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক prejuনে মশাল হস্তান্তরের গল্প লিখে চলেছে। গতকালের ফাইনালেও সেই গল্পেরই নতুন এক অধ্যায় লেখা হলো, যেখানে লিওনেল মেসির কাছ থেকে আলো কেড়ে নিলেন লামিনে ইয়ামাল। পেলে ও এমবাপ্পের পর আরও একজন তরুণ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ জয় করার গৌরব অর্জন করলেন তিনি।


