কমল চক্রবর্তী কবি ও কথাসাহিত্যিক, গত ৩০ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ‘কৌরব’ সম্পাদক হিসেবে তিনি খ্যাতিমান ছিলেন। তাকে নিয়ে এবং ভালোপাহাড় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই লেখাটি ২০১৭ সালের ২০ জুন বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত হয়, আজ পুনর্মুদ্রণ করা হলো।
এক.
কতকাল পরে ফের সবাই বসেছে মুখোমুখি
প্লেটে প্লেটে গরম খিচুড়ি চালানি মাছের পেট
এমন নিজস্ব দিন, আহা দীর্ঘ হোক
এমন দিনেই শুধু বন্ধুর জুতোর কাঁটা দাঁতে করে তুলে ফেলা যায়
কাঁধে হাত বলা যায় সীতানাথ, তোমার বিয়ের দিন ট্রেন স্ট্রাইক হলে
মুখেতে লাগাম এঁটে নিয়ে যাব ছাদনাতলায়।
মাথার হাজার হাজার নিউরনের মধ্যে কোথাও কবিতাটা ভীষণভাবে আটকে গিয়েছিল অনেক আগেই; কবিতা—জামসেদপুরে বর্ষা। কবি—কমল চক্রবর্তী। কৌরবের কমল চক্রবর্তী। ভালোপাহাড়ের কমল চক্রবর্তী। এতটুকুই জানা প্রবাহের মধ্যে আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ে তাকে নিয়ে আরো অনেক অনেক গল্প। বন্ধু ঋপনের কাছ থেকেই তো শুনেছিলাম ভালোপাহাড়ের কথা, প্রথম। তারপর বইপত্র, আরো খোঁজ—একজন কবি শহর ছেড়ে, আধুনিক সভ্যতা ছেড়ে পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ডের সীমান্তবর্তী ঊষর পাহাড়ের ভেতরে ডেরা বেঁধেছেন কবিতার জন্য, বৃক্ষের জন্য, আদিবাসী নিরক্ষর শিশুদের জন্য, পথ্যহীন হাজার বছরের পাহাড়ি মাটির সন্তানদের ওষুধ—শীতের কাপড়ের জন্য। বাতাসে ভেসে বেড়ানো এই সামান্য গল্প থেকেই আমরা বন্ধুরা কতবার, কতভাবে ভেবেছি—শহর ছেড়ে দূরে কোনো গ্রামে গিয়ে এভাবে বাঁচব, হয়নি। পারিনি। চেষ্টা করে যাচ্ছি। আপাতত ভালোপাহার আমাদের স্বপ্নসূত্র। আরো জানার প্রয়োজন ভালোপাহার নিয়ে। খোঁজ চলছে। সশরীরে গিয়ে দেখে আসতে হবে। কবার কলকাতা গিয়েও ভালোপাহাড়ে যাওয়া হলো না। যাব যাবই চলছিল।
এরই মধ্যে একদিন রাত—বিবিসির খবর বেজে চলেছিল পাশের ঘরে, নাসরিন শুনছিলো প্রতিদিনের মতো নিয়ম করে। হঠাৎ ছুটে এলো আমার পাশে—ওর হাতের মোবাইল ফোনের রেডিও মাধ্যমে কারো সাক্ষাৎকারের কথাগুলো স্পষ্ট হচ্ছিল আমার কাছে। অনেকটা আপ্লুত হয়েই নাসরিন বলল—তুমি যে কমল চক্রবর্তীর কথা বলো অহোরাত্রি, শুনে দেখতো ইনিই তিনি কি না! হ্যাঁ—কমল চক্রবর্তী। ঊষর পাহাড়ের গায়ে লক্ষ লক্ষ গাছ লাগাবার গল্প করে যাচ্ছেন। নিজের হাতে গড়ে তোলা বনে পাখিদের গানের কথা বলে চলেছেন। আমরা বালিশে হেলান দিয়ে শুনে যাচ্ছি। জানলাম—ব্যক্তি কমল চক্রবর্তী একজন মস্ত বড় প্রকৌশলীও। উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় স্টিল কোম্পানি টাটার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। চাকরিবাকরি ছেড়ে পাহাড়ে পাহাড়ে মেতেছেন বৃক্ষায়ন নিয়ে। আদিবাসী ছেলেদের লেখাপড়া নিয়ে। বিবিসির সাক্ষাৎকার পর্ব শেষ হলে আমরা দুজনেই আরো কিছুক্ষণ বুঁদ হয়ে রইলাম ভালোপাহাড়ের গল্পে।
ভালোপাহাড় নিয়ে ক্রমশই আগ্রহ বেড়ে চলছে। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন শিল্পী ধ্রুব এষের পল্টনের বাসায় গেলাম আড্ডা দিতে—সেই বছর বইমেলায় ওনার একটা বইয়ের প্রচ্ছদ করেছিলাম বলে নিজেই ফোন করে বললেন—এসো একদিন আড্ডা দিই। ধ্রুবদা সেই মুহূর্তে বাসা বদলাচ্ছিলেন। বাসার অনেক কিছুই নতুন বাসাতে চলে গেছে, কিছু রঙের কৌটা আর কয়েকটি পত্র-পত্রিকা, বই পড়ে আছে মেঝেতে। ধ্রুবদারই প্রচ্ছদ করা লাল মলাটের একটা ‘নতুন কবি সম্মেলন’—এর শারদীয় সংখ্যা হাতে নিয়ে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখছিলাম। চিত্রশিল্পী মার্লে ডুমাকে নিয়ে হিরণ মিত্রের একটা লেখাতে আটকে গেলাম। এই লেখাটির কপৃষ্ঠা ফটোকপি করে নেওয়ার কথা ধ্রুবদাকে বলতেই, বললেন—তুমি নিয়ে যাও, আমার আর লাগবে না। ভীষণ আনন্দ নিয়ে বাসায় ফিরে পাতা উল্টাতে উল্টাতে আনন্দ আরো বিশাল হয়ে উঠলো—শংকর চক্রবর্তীর ‘কবির পাহাড়, ভালোপাহাড়’ লেখাটা দেখে। টানা দমে পড়ে ফেলা গেলো—ভালোপাহাড় নিয়ে জানা হলো বস্তনিষ্টভাবে, একটা মানসিক যোগ তৈরি হলো ভালোপাহাড় নিয়ে, কবিদের আশ্রম নিয়ে, আদিবাসী শিশুদের প্রার্থনা সংগীত নিয়ে, পলাশ উৎসব নিয়ে। এবার যেতেই হবে।
১৯৯৪-৯৫ এর দিকে কলকাতা বইমেলায় কৌরবের স্টলেই কমল চক্রবর্তী বন্ধুদের জানিয়েছিলেন—কবিদের জন্য একটা জায়গা খুঁজছি, তোরা থাকবি আমার সাথে। তারপর বন্ধুদের বরাবর কমল চক্রবর্তীর চিঠি আসতে থাকে—জামশেদপুর থেকে স্কুটার-বাইক চড়ে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় জমি সন্ধানের গল্প। পুরুলিয়ার ধু-ধু প্রান্তর, চারপাশে নিকটবর্তী পাহাড়ের ছবি, সাঁওতালি গ্রাম—স্থির হলো সেখানেই। বন্ধুরা টাকা পাঠাচ্ছে যার যতটুকু সম্ভব—কারো অফিসের মাসিক বেতন, অফিসের জিএফ থেকে তোলা টাকা। কী করছে কমল এসব টাকা দিয়ে—সবাই জানতো—কবিদের জন্য এক নিজস্ব বাসভূমি হচ্ছে সেখানে। দিনে দিনে গড়ে উঠতে লাগলো ভালোপাহাড়। পাজামা গুটিয়ে সেই পাথুরে মাটিতে একের পর এক চারাগাছ পুঁতে চললেন কমল চক্রবর্তী, সাথে বারীণ ঘোষাল, দেবজ্যোতি দত্ত, আরো কেউ কেউ। জলের ব্যবস্থা হলো, চারাগাছগুলো বৃক্ষ হয়ে উঠলো। অশ্বত্থ, পাকুড়, শিমুল, সপ্তপর্ণী, গামার, মহুয়া, হরতকি, অর্জুন, শাল, শিরীষ, মেহগনিতে ছেয়ে গেলো প্রায় ৭৬ একর পাথুরে প্রান্তর। প্রায় ৬ লক্ষ সবুজ বৃক্ষ বাতাসে খেলে বেড়াচ্ছে এখন। পুরুলিয়ার বান্দোয়ান থেকে একটি রাস্তা কুচিয়া গ্রাম পেড়িয়ে চকচকে পিচরাস্তা ধরে দুয়াসিনি ফরেস্টের দিকে চলে গেছে, তার দুধারেই ‘ভালোপাহাড়ে’র নিজস্ব জমি, ১৯৯৬ এ ভালোপাহাড় নামেই পুঞ্জীয়ন হয়েছে।
আমার পাসপোর্টের মেয়াদ ফুরিয়েছে, নতুন পাসপোর্টের অপেক্ষায় আছি। এর মধ্যে একদিন আমাদের বন্ধু-বড়ভাই, কলকাতার অভিযান পাবলিশার্সের প্রধান মারুফ হোসেন ঢাকা এলেন। তার আগেই অভিযান থেকে প্রকাশিত কমল চক্রবর্তীর উপন্যাস সমগ্র ১ম খণ্ড হাতে এসেছে ডাক্তার বন্ধু মাহফুজের মাধ্যমে। তার আগেও কলকাতার ধ্যানবিন্দু থেকে নিজেই সংগ্রহ করেছিলাম ‘ধুম লেগেছে’। ‘ধুম লেগেছে’র পাতায় পাতায় আরো গল্প ভালোপাহাড়ের। শাহবাগের পাঠক সমাবেশে মারুফের সাথে আড্ডা। কমল চক্রবর্তীর উপন্যাস সমগ্রের কাভারটা খুব ভালো হয়েছে মারুফ ভাই—বলতেই তিনি বললেন, কমলদা তো এখন বাংলাদেশে, জানো। কী বলো তাই, মনটা চঞ্চল হয়ে উঠলো—উনি কোথায় আছেন? কুষ্টিয়াতে—লালনের ছেঁউরিয়া, রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ, মীর মশাররফের লাহিনী পাড়া, কাঙাল হরিনাথের কুমারখালি চষে বেড়াচ্ছেন। মনটা আরও চঞ্চল হয়ে উঠলো। কুষ্টিয়া, আমার বাড়ি, আমার অবাধ বিচরণের আধার।
মারুফের থেকে কমলদার বাংলাদেশের চলতি ফোন নাম্বার সংগ্রহ। বাসা ফিরতে রাত। শেষতক সকাল নাগাদ ফোন করলাম, ধরলেন অন্য কেউ। কমলদাকে চাইতেই চিল্লিয়ে উনি ডাকলেন—কমলদা, তোমার ফোন। আমার কানে তার কণ্ঠ ভেসে এলো—কমল বলছি। ছবিতে চেহারাটা দেখা আছে আগেই। সাদা দাড়ি আর চুলে শোভিত এক সন্ন্যাসী। বনজঙ্গলে থাকেন।
দাদা, আমার নাম মোস্তাফিজ, ঢাকা থেকে বলছি। আপনার পাঠক। ভালোপাহাড় নিয়ে ভীষণ আগ্রহ। আপনি আমাদের দেশে এসেছেন, মারুফ জানালো। আমি দেখা করতে চাই।
আমিতো এখন সিলেট, শাহজালালের মাজারে। রবিবার ঢাকা থাকব।
আচ্ছা দাদা, রবিবার আমি ফোন করব।
রবিবারে ফোন। শান্তিনগরের একটা বাড়িতে দেখা। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সাদা ফতুয়া ধরনের একটা পোশাক, পরনে সাদা ধুতি, মুখে সাদা দাড়ি, মাথাভর্তি সাদা চুলের সেই ভালোপাহাড়ের সন্ন্যাসীর সামনে আমি। মুহূর্তেই অতিসহজ, আপন; আর অজস্র কথা। বাংলাদেশের মানুষকে কাছে পেলে ভীষণ আবেগ আপ্লুত হয়ে বাঙাল ভাষায় কথা বলতে শুরু কারেন।
আমি ভাবছিলাম, আপনি কোনো বয়স্ক মানুষ হইবেন, এহন দেখি বালক। আমার লেখা পড়লেন কোথথাইক্যা। কিছুক্ষণের মধ্যে সম্মোধন তুমি, তুমি থেকে তুই। বাংলাদেশ বেড়ানোর গল্প করছিলেন। আমার বাড়ি কুষ্টিয়ায় শুনে খুব খুশি হলেন। পরদিন আমি তাকে নিয়ে গেলাম পানামনগর। সারাদিন সেখানে। অজস্র কথা। সেবার কমলদার বাংলাদেশ ভ্রমণের শেষ দুদিন একটানা তার সাথে থাকলাম। আমাদের দেশের জঙ্গিবাদ, রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা চললো। আমরা লেখক-শিল্পীরা কতটা নাজুক আছি ভয়ে, অনেকটা পলাতক—এইসব। অভয় দিলেন বারবার। ভালোপাহাড়ে চলে আয়। ওটা কবিদের-শিল্পীদের পৃথিবী। ওখানে কোনো ধর্মালয় নেই, রাজনীতি নেই। বৃক্ষ আছে, পাখি আছে। চলে যাওয়ার দিন একটা ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা চটি বই বের করে হাতে দিয়ে বললেন—এটাই আমার ধর্মগ্রন্থ ‘হে বৃক্ষনাথ’। একে একে আরো অনেকগুলো বই বের করে হাতে ধরিয়ে বললেন—এগুলো আজ কদিন ধরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। কাউকে দিইনি। কী জানি কেনো। হয়ত তোকে দেবো বলে। এগুলো সব তোর। কী করবি তোর ব্যাপার, পড়বি, ফেলে দিবি, না কাউতে দিবি—তোর ব্যাপার। সব শেষে একটা বই হাতে দিয়ে বললেন—পৃথিবীতে অনেক পুরাণ আছে, এটা আমার পুরাণ ‘ব্রহ্মভার্গবপুরাণ’। আর কোনোদিন এমন লেখা লিখতে পারব না। তোর কাছে রাখ। রেখে দে। বইগুলো বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আমি কমলদাকে কলকাতার বাসে তুলে দিলাম। রাত ১২.৩০। বাসে ওঠার সময় বললেন—তোর সাথে এই ৭৩ বছর বয়সে কেনো দেখা হলো, আমার যৌবন বয়সে দেখা হলে অনেক কাজ করার ছিল রে। তোর মতো ছেলেদের দরকার এখন। আমি তার চোখের দিকে আর তাকাতে পারলাম না। রাত গভীর। ছোটবেলায় মসজিদের ঈমামের কাছে আরবি শিখতে যাওয়ার সময় মা যেভাবে বুকের সাথে ‘আমপারা’ ধরিয়ে দিতেন, ঠিক সেভাবে বইগুলোকে বুকে জড়িয়ে বাড়ি ফিরলাম।
ভোর ৫.৩০। কমলদা বেনাপোল ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে ফোন করলেন—তোর সাথে আরো আগে দেখা হওয়া দরকার ছিল। অনেক কাজ করার রয়ে গেছে পৃথিবীতে। সব সুন্দর মানুষগুলো একত্রিত হতে হবে, কারিগর।
দুই.
গত মে’র মাঝামাঝি চললাম পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতাতে পৌঁছে একরাত পার করলাম। এর মধ্যে ফোনে ভালোপাহাড়ে যাওয়ার রাস্তা বুঝে নিয়েছি কমলদা’র কাছ থেকে। অভিযানের মারুফের থেকে বুঝে নিলাম সরাসরি। সকাল ৫.৩০। হোটেল থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে হাওড়া। টিকিট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটা হলো। ট্রেনের নাম ‘ইস্পাত’। আমাকে নামতে হবে গালুডি নামের স্টেশনে। পড়ে জানতে পেরেছি গালুডি ঝাড়খণ্ডের সীমানার মধ্যে। স্টেশনে দীপক নামের এক স্কুটার চালককে আগে থেকেই বায়না করে রেখেছেন কমলদা। উনি আমাকে পৌঁছে দিবেন ভালোপাহাড়।
৬.৫৫ এর ট্রেন, দ্রুতগামী। জানালার বাইরে চোখ। কিছুদূর যেতে না যেতেই ট্রেনলাইনের দুধারে বিস্তীর্ণ পদ্মফুলের সমারোহ দেখবার মতো। খড়গপুর পেরিয়ে বোধানা-জয়নগর ফরেস্টের ভেতর দিয়ে ঝাড়গ্রাম; দুধারে শালবন—সবুজ সবুজ। পশ্চিমবঙ্গের সীমানা পেড়িয়ে ট্রেন ছুটেছে ঝাড়খণ্ডের দিকে; চাকুলিয়া, ধলভূমগর, ঘাটশিলা—পরের স্টেশনই গালুডি। আমাকে নামতে হবে। স্টেশনে নেমেই কিছুক্ষণের মধ্যে একজন হাত নাড়িয়ে ডাকলো—উনিই দীপক। স্কুটার চলল ভালোপাহাড়ের পথে। ঝাড়খণ্ডের সীমানা পেড়িয়ে আমরা চলেছি পেছনের দিকে, পশ্চিমবঙ্গের সীমানায়। কিছুদূর যেতেই চারপাশে উঁচু উঁচু পাহাড় ঘিরে ধরলো। আর একটু এগুতেই দুয়াসিনি ফরেস্ট। দুধারে শালবন, পাহাড়ের খাঁজ কেটে ঢেউ-সর্পিল রাস্তা, হঠাৎ দু-একটা পাহাড়ি হ্রদ। ছোট ছোট সাঁওতালি গ্রাম। মিনিট ৪০ এর পথ। ভালোপাহাড়। দীপকের স্কুটার এসে দাঁড়ালো ভালোপাহাড়ের রাজদরজায়। চারদিকে শান্ত, নিরিবিলি, জনমানবশূন্য, পাখির কূজন—বৃক্ষে ঘেরা ভালোপাহাড়ের প্রধান কমপ্লেক্স। স্কুটার থেকে নামতেই দীপক ভেতরে নিয়ে চললো। অসংখ্য গাছগাছালি, ফুল-লতাপাতায় ঘেরা একটা নিঝুমপুরি। কমল চক্রবর্তীকে দেখিয়ে দীপক বলল—ওইতো বাবু ওখানে, লিখছেন। সাদা চুল দাড়িওয়ালা এক সন্ন্যাসী নিঝুম তপোবনের ভেতরে বসে লিখে চলেছেন—ধ্যানমগ্ন। আমি ধীর-বিড়ালের পায়ে হেঁটে গিয়ে পেছনে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পরে লিখতে লিখতে কমলদা বললেন—চলে এলি এতদূর। তারপর মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—চিনতে পারলি তাহলে।
খাঁ খাঁ দুপুর। বেশ গরম। আমি ব্যাগ-পেটরা রেখে বসলাম। কমলদা লিখতে লিখতেই বললেন—কী খাবি বল।
না, এখনই কিছু খাব না। শুধু জল।
চা খা তাহলে।
কিছুক্ষণ বসে জিরিয়ে নিতেই, বললেন— আয় আমার সাথে।
৭৩-এ কমল চক্রবর্তী। দুম দাম করে হেঁটে চলেছেন, আমি পেছনে তাল মেলাচ্ছি। নিচতলার একটা ঘর খুললেন চাবি দিয়ে।
আয় ভেতরে। আর কখনো তো ঢুকতে পারবি না।
একটা ছোট্ট ঘর। মেঝে থেকে ছাঁদ অবধি বইপত্তর। ভেতরে ছেলেদের হস্টেলের মতো একটা সিঙ্গেল সরু বেড, সেটাও ঢাকা বইপত্তরে।
কী একটা খুঁজতে খুঁজতে বললেন—এটাই আমার ঘর। রাতের বেলা বইপত্র ঠেলে এখানেই ঘুমিয়ে থাকি।
বললাম— রাতে আড্ডা দেব এখানে।
এতো জায়গা থাকতে এখানে কেনো।
বুঝলাম তার নিজের এই গুহার ভেতরে অন্যদের ততটা প্রবেশাধিকার নেই।
হেঁটে হেঁটে সমস্ত বাগান, গাছপালা দেখাচ্ছেন। এটা—আঙুর, এটা—থাই বট, এটা—চন্দন, এটা—কফি, এটা—আপেল, এটা—মুচকুন্দ, এটা—জামরুল। আগের দিন বৃষ্টিতে স্নাত হওয়া, নিচের দিকে একটুখানি সিঁদুর জড়িয়ে গাছভরা সাদা সাদা জামরুল দুলছে। জামরুলগুলো হাতে ছুঁয়ে চুমু খাচ্ছেন কমল দা—আহ্ কী সুন্দর, দেখ। আমি জামরুল দেখার চেয়ে গভীর করে তাকিয়ে তাঁর চোখের দিকে। রূপকথার ধনভাণ্ডারের নীলকান্ত মণির মতো জ্বলছে ৭৩ বছরের দুটো চোখ। কামরাঙা গাছের কাণ্ড থেকে বেড়িয়ে আসা থোকা থোকা কামরাঙা ফুল দুহাতে জড়িয়ে বলছেন—দেখ, দেখ—আমার এখানে কোনো ধর্ম নেই, রাজনীতি নেই—লক্ষ গাছ আছে, ফুল আছে, পাখি আছে। মানুষ দেখলে আমার অসহ্য লাগে। সভ্যতা ছেড়ে আমি এই জঙ্গলে। সাপের সাথে, অন্ধকারের সাথে, এই আদিম-বন্য নির্জনতার সাথে ২২-২৩ বছর, একা। একদম একা। বেঁচে আছি।
ছোট প্রাচীরে ঘেরা মূল প্রাঙ্গণের পেছনের দরজা পেরিয়ে স্কুল ঘরের দিকে আমরা। বাচ্চাদের ক্লাস শেষ হয়েছে। পলাশরঙা পোশাকে গুটিগুটি পায়ে ছেলে-মেয়েরা দুপুরের খাবার খেতে চললো। বিরাট বিরাট পাত্রে বাসুদার রান্না শেষ হয়েছে ততক্ষণে। সাজানো বাগানের সামনে দোতলা স্কুলঘর, পাশে বিরাট খেলার মাঠ, পাশে সোনাঝুরির বন। তার পেছনে খাঁজকাটা একফসলী ক্ষেতের জমিনে পড়ে আছে ধানগাছের সোনালি অবশিষ্টাংশ; সেই মাঠের ওপারে সাঁওতালি গ্রামগুলো ছবি হয়ে আছে, আর গ্রামগুলোকে ব্যারিকেড দিয়ে আছে দূরের পাহাড়। খেলার মাঠের পাশে স্কুলের বিরাট নতুন বিল্ডিং নির্মাণাধীন। সামনে বান্দোয়ান থেকে দুয়াসিনির দিকে যেই রাস্তা ভালোপাহাড়ের মধ্য দিয়ে সর্পিল, সেই পিচ রাস্তার পাশে ভালোপাহাড়ের ছোট্ট পার্ক। অজস্র ফুল গাছ সমস্ত জুড়ে।
উপরে নিচে মিলে ৭টা গেস্টরুম আছে ভালোপাহাড়ের। নিচের দিকের একটা কক্ষে আমার থাকার জায়গা হলো। বিকেলে আমি নিজেই এদিক ওদিক ঘুরছি। রাস্তার ওপাশে খামারবাড়ি। লাগোয়া ছেলেদের আবাসিক হস্টেল। মেয়েদের থাকার ব্যবস্থা প্রধান কমপ্লেক্সের ভেতরেই। খামারবাড়ি, ছেলেদের হস্টেলের পেছনেই ভালোপাহাড়ের বিস্তীর্ণ বন-জঙ্গল। সেদিকে এগুতেই তুমুল বৃষ্টি, দ্রুত ছুটে প্রধান কমপ্লেক্সের ভেতরে ঢুকে দেখি—বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিন্তিত কমলদা, ফোন কর ফোন কর করে চিল্লাচ্ছে—আমাকে দেখে শান্ত হলেন। কোথায় গিয়েছিলি?
এইতো খামারবাড়ি।
দেখলি?
বৃষ্টি চলে এলো যেতেই।
আচ্ছা, কাল সকালে হবে সেসব।
সেদিন ভালোপাহাড়ে অমিতদার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। অমিত হালদার বললেন, সামান্য লেখালেখি করি, পুরুরিয়াতে অফিসের কাজ থাকে প্রায়। কলকাতা থেকে পুরুরিয়া এলেই ভালোপাহাড়ে আসা হয়। দাদার সাথে গল্প করি, ভালোপাহাড়ের অ্যাকাউন্টসের কিছু কাজ আছে কম্পিউটারে, সেগুলি গুছিয়ে দিই।
বৃষ্টি হয়ে নিস্তব্ধ থেকে নিস্তব্ধতর ভালোপাহাড়। রাতের আঁধার কত মোহন হতে পারে ভালোপাহাড়ের এই নির্জন অরণ্যময় অন্ধকার আমাকে তা দেখালো। সেই অন্ধকারের মধ্য দিয়ে দূরে দলমা পাহাড়ের ধ্যানমগ্ন চূড়াগুলো ভেসে ভেসে আছে। দলমা পাহাড়ের পেছনের আকাশ জামসেদপুর-টাটা নগরের কলকারখানার উজ্জ্বল আলোর রে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ছেয়েছে, তার ক্ষীণ আভা ভালোপাহাড়ের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়েই দেখা। বিদ্যুৎ নেই বিকেল থেকে, আমাদের কারো ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। কেউ কোথাও যোগাযোগ করতে পারছি না। বাংলাদেশের বাড়িতে যোগাযোগ করতে পারছি না, পরেরদিন সকালে অনুপদা—কবি অনুপ চণ্ডাল আসবেন ভালোপাহাড়ে। একদিন আগেই বাংলাদেশ থেকে কলকাতা এসে আছেন তিনি। ঠিকঠাক পথনির্দেশ দেওয়া হয়নি তাকে। ফোনে পড়ে জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারছি না। সত্যিই সভ্যতা ছেড়ে দূরের এক পৃথিবীতে তখন ভাসছি আমি। অমিতদা বলল—চলো। দুজন দুটো টর্চ নিয়ে ভালোপাহাড়ের সামনে দিয়ে কোনো এক সাঁওতাল রমণী আঁচল বিছাতে বিছাতে যে রাস্তা গড়ে গেছে, সেই সর্পিলতা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আরও এক গহিন নির্জন পথে চলেছি। একটা কালভার্টের উপর বসে দলমা পাহাড়ের দিকে চেয়ে আছি। নিশ্চুপ। এমন আদিম অরণ্যময় অন্ধকারের মধ্যে বারবার মনে হচ্ছিল পাথুরে খাঁজকাটা এক-ফসলী মাঠ পেড়িয়ে গিয়ে দলমা পাহাড়ের চূড়াতে গিয়ে দাঁড়ায় বা দুয়াসিনি ফরেস্টের শালবনে গিয়ে বলি—মানুষের সভ্যতা শোনো, আর ফিরছি না আমি তোমাদের আলোতে।
রাতভর অনুপ’দার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। খুব ভোরে উঠে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছি—কোথাও গেলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় কিনা। নেটওয়ার্ক পেতে পেতে ৮.৩০ হয়ে গেলো, ফোনে অনুপ’দাকে যতক্ষণে পেলাম ততক্ষণে আগের দিনের খসড়া পথনির্দেশ মনে রেখে উনি ট্রেনে চেপেছেন ঠিকঠাক, খড়গপুর পেড়িয়েও এসেছেন। রাতেই অন্য একটা বিকল্প ফোনে স্টেশন থেকে অনুপদাকে রিসিভ করার জন্যে দীপককে জানিয়ে দিয়েছিলেন কমলদা। ১২.৩০ অবধি অনুপদা যখন ভালোপাহাড়ে, আমি আর অমিতদা ভালোপাহাড়ের ডাক্তার দিলীপ বাবুর ডিসপেন্সরিতে আড্ডা দিচ্ছি।
দুপুরের খাওয়া হলো—বাসুদার সেই অপূর্ব সব সবজি, সাথে ভালোপাহাড়ের খামারের গরুর দুধে বানানো দই। একটুখানি দুপুরের ভাতঘুম। বিকেল অবধি খোলা বারান্দায় আমাদের অন্তহীন আড্ডা।
কমল দা : এখানে কিচ্ছু ছিল না। খাঁ খাঁ প্রান্তর। কোনো গাছ নেই, মানুষ নেই। একটা স্কুটার নিয়ে আমি এখানে আসতাম। একটা শালপাতার কারখানা ছিল এখানে, এই যে আমরা এখন যেখানে বসে আছি। শালপাতার কারখানার জমিটুকু প্রথমে কেনা হলো। এই যে আমরা যে গোল ছাউনি ঘরে বসে আছি, ভালোপাহাড়ের প্রথম স্থাপনা এটাই। তারপর আস্তে আস্তে এসব।
আমি : এখানে তো মাওবাদীদের আস্তানা ছিল। ওরা কোনো সমস্যা করেছিল তখন? একা এসে থাকলেন। ওদের কৌতূহল ছিল না?
কমল দা : ছিল। আসতো। রাত-বিরেত আসতো। কোনো সমস্যা করেনি।
আমি : এখানকার প্রশাসনের লোকেরা কীভাবে নিয়েছিল ভালোপাহাড়ের শুরুটাকে?
কমল দা : অনেক জিজ্ঞাসা ছিল তাদের। চোখের উপরতো দেখেছে আমি কী করেছি। এখানে পাখি ডাকতো না, বৃষ্টি হতো না।
অনুপ দা : এরকম একটা নীরস, নির্জনে চলে এলেন…
কমল দা : চলে এলাম। আমি তো জামসেদপুরে বড় হয়েছি। টাটাতে চাকরি করেছি। ওই শহরটাকে আমি দেখেছি। কী নেই সেখানে। ঝা চকচকে সভ্যতা। সব আছে। কেবল মানুষের কৃষ্টি নেই, সংস্কৃতি নেই। কেউ কবিতা পড়ত না, নাটক দেখতো না। আমি ওখানে মেলা করেছি, কবি সম্মেলন করেছি। কলকাতার সব প্রধান কবিরা আমার ডাকে জামসেদপুরে চলে আসতো।
অনুপ দা : কৌরবতো জামসেদপুর থেকেই বেরোত।
কমল দা : হ্যাঁ।
আমি : কৌরব নামটা কার দেওয়া, দাদা?
কমল দা : আমরা একবার একটা মঞ্চনাটক করেছিলাম। কলেজ স্ট্রিটে। ৭০-এর দিকে। আমি স্ক্রিপ্ট লিখলাম। অনেক এদিক ওদিক হলো নাটকের দলের নাম নিয়ে। আমি ঠিক করলাম—কৌরব। পরে আমরা সেই নামেই পত্রিকা করলাম ১৯৭১ সালে। আমরা তখন কবিতা কবিতা করে জীবন ওলটপালট করে দিচ্ছি।
আমাদের আড্ডা চলতে থাকে—সন্ধ্যা হচ্ছে, ভালোপাহাড় জুড়ে রাতের আশ্চর্য মায়া নেমে আসছে চারদিকে। আমরা কখনো পশ্চিমের স্কাইলাইনে রুয়াম পাহাড়ের চূড়ার দিকে, কখনো পূবের দলমার দিকে নীরব তাকিয়ে আছি। এতোই নির্জন যে, প্রকৃতি এখানে ধ্যানমগ্ন। সন্ধ্যাবেলায় ভালোপাহাড়ের আবাসিক ছাত্র-ছাত্রীদের সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা। কমলদা আমাদের নিয়ে গেলেন সান্ধ্যকালীন প্রার্থনায়। সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইছে—‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে’। পর পর তিনটা রবীন্দ্রসংগীত, তারপর একটি ইংরেজি রাইম, শেষে সবাই সমস্বরে—জয় বৃক্ষনাথ।
সন্ধ্যায় চা-বিস্কুট। আড্ডা, কথা। রাত মাধুর্য্যময় হয়ে উঠছে। অনুপদা তার প্রকাশিত শেষ কবিতার বই ‘কেউ তবে গাহিতেছে গান, ভ্রমাকুল’ কমলদার হাতে দিলেন। উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখতে দেখতে বললেন—অনুপ, তুমি পড়ো। কারিগর যা, তুই তোর বই নিয়ে আয়, এখন কবিতারাত। অনুপদা কবিতা পড়লেন নিজের বই থেকে, কমল চক্রবর্তীর ‘মিথ্যে কথা’ বই থেকে বেশ কিছু কবিতা পড়লেন। তারপর কমলদা অনুপদার হাত থেকে বইটা টেনে নিয়ে একটার পর একটা কবিতা পড়ে যেতে লাগলেন নিজেই—
নদীর ধারে এই বাড়ি কারও নয়
কাঠ শুকোবার জন্য কোনো কোনো পূর্ণিমা খোলা পড়ে থাকে
সিঁড়ির মুখে দোল খায় চ্যাম্পিয়ানের মৃতদেহ
ভরা বোতল রম থেকে যায় কলাপাতায় সাজানো
নদীর ধারে এই বাড়ি কারও নয়
নদীর ধারে এই বাড়ি কারও কোনোদিন নয়
নদীর ধারে এই বাড়ি, চ্যাম্পিয়ান বেড়াতে এসেছিল।
কমলদা পড়া থামিয়ে বললেন—মোস্তাফিজ তুই পড় এখন। সে এক আশ্চর্য সময় পৃথিবীতে এলো আমাদের। এমন একটা মোহন কবিতার রাত—সত্যি ভাবা যায় না।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা সাঁওতাল গ্রামে ঘুরতে যাব, রাতেই ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু হলো না। ঘুম ভেঙে খোলা বারান্দায় যেতেই দেখি কমলদা লিখে চলেছেন নিবিড় হয়ে। আমরা পাশে গিয়ে বসলাম, চা এলো। কথা হচ্ছে—দুই বাংলা নিয়ে, দেশভাগ নিয়ে, বাংলা ভাষা নিয়ে, বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে। দেশভাগ নিয়ে, বাংলাভাষা নিয়ে, বাংলাদেশের জঙ্গীবাদ-ধর্মান্ধতা নিয়ে কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ভেতরের যন্ত্রণা—ঘা থেকে অজস্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সারা ভারতবর্ষে। কলকাতার বাংলা স্কুলগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একে একে। প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা হিন্দি-বাংলা মিলিয়ে একটা উদ্ভট ভাষায় ভেসে যাচ্ছে।
কথা বলতে বলতে সকাল গড়িয়ে চলেছে। খড়ে ছাওয়া খোলা গোলঘরটার মধ্যে বসে আমাদের কথা চলছে। ঘুরে ফিরে বারবার বৃক্ষের কথা বলছেন—বৃক্ষ আমার ধর্ম, জয় বৃক্ষনাথ। দেখ চারদিকে এতো সবুজ, কিচ্ছু ছিল না এসবের। ঐ দেখ, দেখ—দুটো অদ্ভুত সুন্দর হলুদ পাখি এসে জবা গাছের ডালে খেলছে। বিমুগ্ধ আমরা দেখছি। কমলদা আবেগ আপ্লুত হয়ে ওঠেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে দূরের দলমা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলছেন—
একটা ছোট গাছ ছিল বিজন পথের ধারে। এক গরীব কাঠুরিয়ার ছেলে গাছের গোড়ায় জল দিয়ে, আগাছা পরিষ্কার করে গাছটিকে বড় করে তুললো। ছেলেটিও একদিন বড় হলো, ভীষণ অভাবী। বিয়ে করলো একদিন, টুকটুকে বউ। অভাবের সংসার। গাছের কাছে এসে বলল—দেখো, আমারতো খুব অভাব, বউ নিয়ে বিপদে পড়েছি। খাবার কেনার টাকা নেই। গাছ বলল—মন খারাপ করো না। এই দেখো আমার কতগুলো শক্ত ডাল এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে, তুমি এগুলো কেটে ফেলো। বাজারে বিক্রি করে খাবার কিনে আনো।
না না তা কী করে হয়।
কাটো না তুমি। এগুলো আমার কাজে লাগছে না।
ডাল কেটে বাজারে বিক্রি করে খাবার আনলো ঘরে। কিছুদিন পর কাঠুরিয়ার ছেলের সংসারে একটা দেবসম শিশু এলো। গাছের নিচে গিয়ে গাছকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ করলো। শিশুটি বড় হলো আস্তে আস্তে। পর্যাপ্ত খাবার নেই ঘরে। গাছকে বলল—কী করি বলতো।
এতো চিন্তা করছো কেনো বোকা ছেলে। আমার শাখায় শাখায় কত মিষ্টি ফল ঝুলছে, এগুলো পেরে বাচ্চাটাকে খাওয়াও। আর আমার পশ্চিম পাশের এই বড় ডাল কেটে বাজারে বিক্রি করো, কিছুদিন চলার জোগান হবে। কিছুদিন পর প্রবল ঝড়ে কাঠুরিয়ার ছেলের ছোট্ট কুঁড়েঘরটি ভেঙে পড়ল। মন খারাপ করে গাছের নিচে গিয়ে বসল। গাছ অভয় দিয়ে বলল—এতো ভেবো না তো। আমার দক্ষিণ দিকের বড় ডালটা কেটে ঘরের খুঁটি বানাও।
এভাবে কষ্টে-অভাবে কাঠুরিয়ার ছেলের দিন কাটতে লাগলো। একদিন গাছের নিচে এসে বলল—দেখো গাছ, আর তো সংসারটা চালাতে পারি না, কী করি বলতো। গাছ আবারও অভয় দিয়ে, তুমি দুশ্চিন্তা করো না তো। যাও কুঠার এনে আমাকে গোড়া থেকে কেটে ফেলো। উপরের সমস্ত মোটা কাণ্ড চিড়ে কাঠ বানাবে, ডালপালাগুলোকে কেটে কেটে লাকড়ি করে বিক্রি করবে বাজারে। আর আমার গোড়ার দিকের শক্ত কাণ্ড চিড়ে একটা নৌকা বানাও, এই নদীতে ভাসাও। পরিবার নিয়ে ঐ দক্ষিণের দিকে চলে যাও, ওদিকে বাণিজ্য আছে। গিয়ে ব্যবসা করবে।
গাছের গোড়া ধরে হু হু করে কাঁদতে থাকলো ছেলেটি। গাছ বলল—কেঁদো না। আমার সমস্ত কিছু তো তোমারই। এই পথ দিয়ে কত মানুষই তো গেছে, কেউ তোমার মতো আমাকে ভালোবাসিনি, আদর করিনি, পরিচর্যা করিনি। নাও দেরি করো না। তাড়াতাড়ি করো। আমার সমস্ত কিছু তো তোমারই।
একটা ৭৩ বছরের আপাত বৃদ্ধের চোখের জল গড়িয়ে সমস্ত সাদা শশ্রুগুলো ভিজিয়ে দিচ্ছে। কমলদার গলা জড়িয়ে এলো শেষ কথাগুলো বলতে বলতে। আমি, অনুপদা স্তব্ধ। আমি নিজেও টের পেলাম ফোটা ফোটা অশ্রু আমার কপোল গড়িয়ে ঠোঁটের কাছে, লবণাক্ত।
সেদিন বিকেলে কমলদা আমাদের নিয়ে ভালোপাহাড়ের সমস্ত জঙ্গল ঘুরলেন। লক্ষ লক্ষ গাছ। হাতে ধরে ধরে প্রতিটা গাছ চিনিয়ে দিচ্ছেন। জঙ্গলের মধ্যে এখনো তিনি এক সদ্য তরুণের মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এক একটা গাছ দেখছেন, আর সেইসব গাছের স্তুতিতে বিহ্বল হয়ে পড়ছেন। আমের বাগানে ছোট ছোট গাছগুলো ছেয়ে অজস্র আম ঝুলে ঝুলে মাটি ছুঁয়েছে। সে কী আনন্দ কমলদার—দেখ দেখ তোরা। চালতার বন পেরিয়ে, সারি সারি অর্জুন পেরিয়ে বড় পুকুরটার পাশ দিয়ে আমরা কাজুবাদামের বনে গেলাম। কমলদা এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে গাছের সাথে কথা বলছেন। ছোট ছোট চারা গাছগুলোর সাথে কথা বলছেন।
পরদিন সন্ধ্যায় আমরা খোলা বারান্দায় বসে আছি। কদিন আগে কলকাতা থেকে এক ভদ্রলোক দামি গাড়ি চড়ে এসে কমলদাকে দুটো মূল্যবান বই দিয়ে গেছেন। তার মধ্যে একটা বই টাটা স্টিলের প্রকাশ করা মকবুল ফিদা হুসেনের একটা বিরাট অ্যালবাম। আগের রাতেই আমার বায়না ছিল—দাদা, বইটা আমি দেখব। সন্ধ্যায় বইটা উপরের ঘর থেকে নামিয়ে আনা হলো। বইটা আমরা কেবলমাত্রই খুলেছি, আর দলমা পাহাড়ের ওপাড় থেকে ভয়ংকর ঝড় তেড়ে এলো। কোনো মতে কাপড়-টাওয়াল জড়িয়ে বইটাকে রক্ষা করা হলো পাশের ঘরে। কিন্তু বারান্দায় রাখা অসংখ্য ফুলের টব একটার পর একটা ছুটে ছুটে পড়তে লাগলো। কমলদা ফুলগাছ-টবগুলোকে বাঁচানোর জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন। ভিজে চুপসে গেছেন ততক্ষণে। আমরাও হাত লাগাচ্ছি সেসবে। ভিজে গেলো পোশাক। তুমুল ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলো। রান্নাঘরের সামনে একটা সুপারিগাছ ভেঙে দু-টুকরো হয়ে পড়ে আছে। একটা ছেলে গাছের ভাঙা অংশটা সরিয়ে হাঁসের ঘরের পাশে রেখে এলো। একটা উপড়ে যাওয়া পেঁপে গাছটা আবার দাড় করানোর দিকে আমরা যখন ব্যস্ত, দেখি—সুপারি গাছের ঐ ভাঙা কাণ্ডটার কাছে গিয়ে নিভৃতে একা দাঁড়িয়ে আছেন ‘ব্রহ্মভার্গবপুরাণ’র লেখক কমল চক্রবর্তী, ‘ব্রাহ্মণ নবাব’র লেখক কমল চক্রবর্তী।
রাতে সবাই মিলে মকবুল ফিদা হুসেনের অ্যালবামটা দেখলাম। কমলদাকে বললাম—ফিদার এই কাজগুলো দেখার জন্যই হয়ত আমাদের এই ঝড় সহ্য করতে হলো।
পরদিন খুব সকালে আমরা বেরিয়ে পড়েছি কলকাতা ফিরে আসার জন্য। কমলদা রাতেই বলে রেখেছিলেন—আমার ঘুম না ভাঙলে ডাকবি। ওই পাখি ডাকা ভোরে তাঁর ঘরের সামনে গিয়ে দেখি বিস্কুট ভেঙে ভেঙে হাঁসগুলোকে খাওয়াচ্ছেন। আমাকে বললেন—মুসলমান থেকে হিন্দু হওয়া যায় কিনা রাতে বলছিলি তো, আমি রাতে ভেবে ভেবে বের করেছি তোর একটা নাম—কারিগর বৃক্ষ। আজ থেকে তোর ধর্ম—বৃক্ষধর্ম।
তাঁকে প্রণাম করে আমি আর অনুপদা স্কুটারে চড়ে বসলাম। কমলদা হাত জড়ো করে জানালেন—জয় বৃক্ষনাথ, জয় বৃক্ষনাথ।