কুড়িগ্রামের উলিপুর থানা চত্বরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক যুবদল নেতার মৃত্যুর ঘটনাটি রাজনৈতিক কারণে নয়, প্রেমঘটিত বিরোধ মীমাংসার জেরে ঘটেছে। প্রেমিককে আটকের ঘটনা মীমাংসা করতে গিয়ে থানা চত্বরে সংঘর্ষে জড়ায় বিএনপির দুই পক্ষ। এতে আহত হয়ে প্রাণ হারান যুবদল নেতা আশরাফুল আলম।
শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় উলিপুর থানা চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আশরাফুল আলম পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তবে সংঘর্ষে আঘাত পেয়ে নাকি উত্তেজিত হয়ে অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ চলছে। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে আশরাফুলের বাবা বাদী হয়ে উলিপুর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় কৃষকদল নেতা আবু জাফর সোহেল রানা ও সাবেক ছাত্রদল নেতা ফিরোজ কবির কাজলসহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ২০ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়। তবে শনিবার দুপুর পর্যন্ত কোনও আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের নন্দুনেফরা গ্রামে (হোসাইনপুর) এক কিশোরকে (১৬) আটকের অভিযোগ উঠে তার প্রেমিকার (১৪) পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে। হয় বিয়ে, না হয় ১০ লাখ টাকা দাবি করেন মেয়েপক্ষের লোকজন। এ নিয়ে কিশোরের বাবা উলিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। মেয়েপক্ষের অভিভাবক এবং গুনাইগাছ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য বাবলু মিয়াসহ চার জন আটকে জড়িত বলে দাবি করেন কিশোরের বাবা। গত বৃহস্পতিবার রাতে গুনাইগাছ ইউনিয়নে কিশোরীর বাড়িসহ সম্ভাব্য স্থানে অভিযান চালালেও কিশোরকে উদ্ধারে ব্যর্থ হয় পুলিশ।
থানায় বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটক প্রেমিককে উদ্ধার এবং মামলা করা নিয়ে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একটি পক্ষ প্রেমিকার পরিবারকে এবং অপর পক্ষ প্রেমিকের পরিবারকে সমর্থন দেয়। বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের দাবি ওঠে। তবে ছেলের পরিবার থেকে টাকা না দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এতে বাদ সাধে বিএনপির অপর পক্ষ।
অভিযোগ উঠেছে, প্রেমিককে আটকের পর থেকে গুনাইগাছ ইউনিয়নের বাসিন্দা ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রমজান কিশোরীর পরিবারের পক্ষ নেন। সেইসঙ্গে প্রেমিককে আটক রাখতে সহায়তা করেন। এ কাজে তিনি উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজীব আহমেদ এবং পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফুল ও তাদের নেতাকর্মীদের সমর্থন নেন। অপরদিকে, যুবদল নেতা রিপন, মহসিন এবং কৃষকদল নেতা ফাজকুরনি ওই কিশোরকে উদ্ধারে তার পরিবারকে সমর্থন দেন। এ নিয়ে দুটি পক্ষ তৈরি হয়। শুক্রবার উভয় পক্ষ বিষয়টি মীমাংসার জন্য থানায় মিলিত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতাকর্মী জানান, আটক কিশোরকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে মেয়েপক্ষের হয়ে টাকা দাবি করেন ছাত্রদল নেতা রমজান ও তার সহযোগীরা। তিনি উপজেলা যুবদলের কয়েকজন নেতার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে কিশোরকে উদ্ধারে পুলিশকে দেন। মামলা করতেও বাধা দেন।
মামলা না করে বিষয়টি সমাধানের জন্য উভয় পক্ষ থানার গোলঘরে বসেন। সেখানে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কিশোরের বাবা ও দুলাভাই উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রমজান উত্তেজিত হয়ে ছেলের বাবা ও দুলাভাইয়ের ওপর চড়াও হন। খবর পেয়ে কৃষকদল নেতা আবু জাফর সোহেল রানা, সাবেক ছাত্রদল নেতা ফিরোজ কবির কাজল, যুবদল নেতা নাজমুল ও মঈনসহ বেশ কয়েকজন থানায় যান। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। উভয় পক্ষকে থামাতে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আশরাফুল। উপস্থিত লোকজন তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বৈঠকে উপস্থিত যুবদলের একাধিক নেতা বলেন, থানার গোলঘরে বৈঠক চলছিল। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তবে আশরাফুলের গায়ে কেউ হাত দেননি। আমরা থানা থেকে বের হয়ে আসার সময় আশরাফুল হঠাৎ মাটিতে পড়ে যান। আমাদের লোকজন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অপহৃত কিশোর এবং অভিযুক্ত কিশোরীর পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবলু মিয়া বলেন, ‘মেয়ে এবং মেয়ের এক খালু ছেলেকে আটক করে রেখেছেন। আমাকে ফোন দিলে বিষয়টি ছেলের পরিবারকে জানাই। পরে পুলিশ এসে ছেলেকে ছেড়ে দিতে বললে মেয়েপক্ষ ১০ লাখ টাকা দাবি করে। এরপর বিষয়টি দলীয় পর্যায়ে যাওয়ায় আমি ওসবে জড়াইনি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ছাত্রদল নেতা রমজানের মোবাইল নম্বরে কল দিয়ে তা বন্ধ পাওয়া গেছে। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
থানার ভেতরে সংঘর্ষ নিয়ে যা বলছে পুলিশ
কিশোরকে আটক এবং বিষয়টি নিয়ে বিএনপির বেশ কিছু নেতাকর্মীর দুটি পক্ষে বিভক্ত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে পুলিশ। উভয় পক্ষের বৈঠক হওয়ার সত্যতা স্বীকার করলেও থানার ভেতরে নয় বরং থানা গেটের বাইরে বিএনপির দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
শুক্রবার থানার দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক আব্দুর রশিদ দাবি করেন, ‘থানায় কোনও বৈঠক হয়নি। প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে ছেলেকে আটকের ঘটনায় থানার গেটে এসে বাগবিতণ্ডায় জড়ায় বিএনপির দুই পক্ষ। চলে যাওয়ার সময় থানার সামনে আবার হাতাহাতিতে জড়ায় তারা। এভাবে আহত হয়ে একজন মারা যান।’
ঘটনার দিন উলিপুর থানার ওসি জিল্লুর রহমান ছুটিতে ছিলেন। থানায় ফিরে তিনি বলেন, ‘প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে এক ছেলেকে আটক রাখার ঘটনায় বিএনপির দুই পক্ষ বিবাদে জড়ায়। তাদের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হলে পুলিশ থানার বাইরে যেতে বলে। তারা চলে যান। থানায় উভয় পক্ষ উপস্থিত হলেও সংঘর্ষ হয়েছে থানার বাইরে।’
ওসি বলেন, ‘মেয়ে পক্ষের হাতে আটক কিশোরের বাবা থানায় মামলা করতে আসলে অপর পক্ষ বাধা দিয়ে মীমাংসার উদ্যোগ নেয়। এর জেরে হাতাহাতি হয়েছে বলে শুনেছি। তবে তা হয়েছে থানার বাইরে।’
‘একজন নিহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। তবে শনিবার দুপুর পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। যে কিশোরকে আটক নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত তাকেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি’ বলে জানান ওসি।