রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলনের’ ব্যানারে ‘বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৮ দফা দাবি’র সপক্ষে সম্প্রীতির সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) সমাবেশে অংশ নিয়ে লেখক ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘আমরা এই দেশের নাগরিক। এই মাটিতে আমাদের জন্ম। এই মাটি থেকে উৎখাত বা বিচ্ছিন্ন করার কেউ চেষ্টা করে, সেটা বাংলাদেশই করুক বা ভারত করুক— ইসলামের চোখে এটা জুলুম। এটার জন্য হাশরের ময়দানে জবাবদিহি করতে হবে।’
সম্প্রীতি সমাবেশের শুরুতে পবিত্র কোরআন, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় ফরহাদ মজহার ছাড়াও অংশ নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী এলবার্ট পি কস্টা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল কাদের, সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলনের নেতা লিংকন দত্তসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর লোকজন।
আলোচনায় ফরহাদ মজহার বলেন, ‘সনাতনীরা তাদের দাবি আদায়ে যদি কথা বলেন, তবে আপনারা কেন তাদের বিরোধিতা করেন? এই কথা বলা ও দাবি আদায়ের অধিকারের জন্যই আমরা ৫ আগস্টে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছি। তাদের এই দাবি কেউ মানুক আর না মানুক, রাষ্ট্রের কাছে তাদের এই দাবি উত্থাপনের অধিকার রয়েছে। টুপি পরি বলে যারা আমাদের কিছুদিন আগে জঙ্গি বলতো, তারাই এখন জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে কথা বলছে।’
‘নামাজ পড়তে পড়তে কপালে কালো দাগ পরলেও মনের মধ্যে যদি অন্য ধর্মের প্রতি যাদের ঘৃণা-হিংসা থাকে, আল্লাহ সেটি বরদাশত করবেন না। আমাদের ধর্মের মধ্যে ঘৃণা বা হিংসা নাই। তবে জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই আছে। যদি কোনও জালিম অত্যাচার করে, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে।’
‘বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে যারা বিভেদ তৈরি করে, কথায় কথায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভারত ও বিজেপির দালাল এবং সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করেন তারা খুব অন্যায় করেন’, উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াত নেতা সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এদেশে যদি ইসলামের শাসন কায়েম হয়, তাহলে আবারও সব জাতি ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।’
যদি কোনও সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার করা হয়, তাহলে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনা উচিৎ বলেও উল্লেখ করেন জামায়াতের নায়েবে আমির। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটা অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা উচিৎ। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের প্রশাসন ভালোভাবে চলে না। আল্লাহর বিধান দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করলেই জুলুম নির্যাতন নিষ্পেষণ বন্ধ হয়ে যাবে।’
আরেকটি বিপ্লব দরকার আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মানবরচিত বিধানে ভুল থাকলেও আল্লাহর বিধানে ভুল নাই। সেই বিধান আবারও চালু করতে হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমরা আশা করছি, তারা প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে একটি ভালো নির্বাচন দেবেন। তবে অকারণে সময় বাড়ালে কিন্তু তারা আস্থা হারাবে।’
সমাবেশে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী এলবার্ট পি কস্টা বলেন, ‘এমন এক সময়ে সমাবেশটি হচ্ছে, যখন সম্প্রতি চট্টগ্রামে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হয়েছে, যেটা এতদিন ছিল না। ১৯৪৮, ১৯৬৪ ও ১৯৭২ সালেও এদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল। এরশাদের পতনের আগেও এই দাঙ্গা সৃষ্টি করা হয়েছিল। আবার ২০২৪ সালেও এ দেশে এই দাঙ্গা সৃষ্টি করা হচ্ছে— এগুলো কারা করছে? এতদিন যারা ক্ষমতায় ছিল, তারাই এগুলো করছে।‘
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছে, তখন তারা বলেছে বাংলাদেশে জঙ্গিরা এই দাঙ্গা সৃষ্টি করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন বলছে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নাই। এই ঘটনাগুলো ক্ষমতায় থাকাকালীন যারা করে আসছিল, এখনও তারাই করছে।’
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির আশপাশে এখনও স্বৈরাচারের দালালরা আছেই। তাদের যদি সরানো না যায়, তাহলে বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন সম্ভব নয়।’