ভোজ্যতেল, বিশেষ করে সয়াবিন তেল নিয়ে আবার ‘খেলায় মেতেছেন’ দেশীয় আমদানিকারক মিলাররা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশে যখন ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে, সেই সুযোগে সয়াবিনসহ সব প্রকার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর ‘নীল-নকশা তৈরি করেছেন’ তারা। ঈদের ছুটির মধ্যেই ১ এপ্রিল থেকে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৮ টাকা বাড়ানোর সব আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া সহজ করতে তারা ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগে শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন বরাবর লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, এ বছর মার্চে রোজা শুরু হওয়ার আগে ফেব্রুয়ারিতে সয়াবিনের বাজার অস্থির হয়ে উঠলে দাম সহনীয় রাখতে সরকার ভোজ্যতেলের শুল্ক ও করে যে রেয়াতি সুবিধা দিয়েছিল, তার মেয়াদ ৩১ মার্চ (সোমবার) শেষ হয়েছে। যদিও এখন সারা দেশে চলছে ঈদের ছুটি। ব্যাংক-বিমা, স্থল-সমুদ্রবন্দর সব কিছুই বন্ধ। এসব কারণে সরকার এখনও এই অব্যাহতির সুবিধা বাড়াবে কিনা, সেই ঘোষণা দেয়নি। তার আগেই সুযোগ বুঝে ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকেরা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সোমবার পর্যন্ত সরকারের দেওয়া কর রেয়াতের সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীরা তার পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) থেকেই লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করতে চান সয়াবিন তেল।
বাংলাদেশ ব্যাংক, আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, ট্যারিফ কমিশন ও বন্দর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ১০ লাখ ৯৫ হাজার ৫২৫ টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮০ টন ও পামতেল ৭ লাখ ১১ হাজার ৪৪৪ টন। এর মধ্যে গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি। এছাড়া, গত জানুয়ারিতে সয়াবিন বীজ আমদানি হয়েছে ৩ লাখ টন। গত এক বছরে এত বেশি সয়াবিন বীজ আমদানি হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সেই সময়ে আরও ৪ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টন তেল আমদানি পাইপলাইনে ছিল যা, রোজার মধ্যে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে সয়াবিনের কোনও সংকট হওয়ার কথা ছিল না। তারপরও সরকার ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় রাখতে গত ১৬ ডিসেম্বর সয়াবিন, পামঅয়েল আমদানিতে শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি ও অগ্রিম আয়কর শতভাগ অব্যাহতি দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ভ্যাট ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ৩১ মার্চ পর্যন্ত এই সুবিধায় আমদানি করা সব সয়াবিন বা পামতেল ৩১ মার্চের মধ্যরাতে শেষ হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও ১ এপ্রিল থেকে যদি আগের হারে শুল্ক ডিউটি ও ভ্যাট দিয়ে যদি সয়াবিন বা পামতেল আমদানি করতে হয়, সেই তেল দেশে এসে পৌঁছাতে সময় লাগবে কমপক্ষে ৪৫ দিন। এর পরে আমদানিকৃত সয়াবিন বা পামতেল পরিশোধন করে বাজারজাত করতে সময় লাগবে কমপক্ষে আরও তিন থেকে চার দিন। সেই হিসাবে যদি দাম বাড়াতেও হয়, তা কার্যকর হওয়ার যৌক্তিক সময় হবে ৪৫ দিন পরে অর্থাৎ ১৫ মে’র পরে। অথচ ঈদের ছটির সুযোগে ভোজ্যতেল আমদানিকারক এবং ব্যবসায়ীরা ১ এপ্রিল থেকে লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করার নেশায় মেতে উঠেছেন।
৩১ মার্চ উঠে যাচ্ছে সরকারের দেওয়া ভোজ্যতেল আমদানিতে শুল্ক রেয়াত সুবিধা। এ কারণে ভাজ্যতেলের দাম প্রতি লিটার বোতলে ১৮ টাকা ও খোলা তেলে ১৩ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ঈদের ছুটির আগে শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) বিকালে পরিশোধনকারী মিল মালিকেরা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে এ আবেদন করেছেন। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে নুরুল ইসলাম মোল্লা এ আবেদন করেন। তাদের আবেদনের বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় পায়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা ট্যারিফ কমিশন, কারণ এর কিছু সময় পরেই ঈদের ছুটিতে চলে গেছে সারা দেশ। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদের ছুটি শেষে আগামী ৬ এপ্রিল খুলবে অফিস আদালত।
প্রস্তাবিত দাম অনুযায়ী, প্রতি লিটার ১৮ টাকা বাড়িয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৩ টাকা, যা আগে ছিল ১৭৫ টাকা। আর খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের লিটার ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে, যা আগে ছিল ১৫৭ টাকা। আগামী ১ এপ্রিল থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে বলে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে।
সরকারের দেওয়া শুল্ক ও কর রেয়াতের অব্যাহতির সুবিধা বাড়াবে কি না, সেই ঘোষণা দেয়নি অথচ তার আগেই দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকেরা। ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সময়ে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ যদি বাড়ানো হয় তাহলে, দাম বাড়বে না, আগের মতোই থাকবে। আর যদি শুল্ক-করের রেয়াতি এই সুবিধা উঠে যায়, তাতে আমদানির খরচ বাড়বে, তখন দাম বাড়ানো ছাড়া আর উপায় থাকবে না।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, রোজার আগে দাম সহনীয় রাখতে গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে কয়েক দফায় ভোজ্যতেল আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ছাড় দেয় সরকার। ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় রাখতে আমদানি পর্যায়ের অব্যাহত শুল্ক-কর রেয়াত ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠি দেয় ট্যারিফ কমিশন। কিন্তু এ সুবিধার মেয়াদ ৩১ মার্চ পর্যন্ত উন্নীত করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল এনবিআর। যেহেতু ট্যারিফ কমিশনকে অবহিত না করে দাম বাড়ানোর যাবে না, সে তারণেই ঈদের ছুটির কয়েক ঘণ্টা আগে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সংগঠন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানীর কাওরানবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, রোজা শুরুর আগে থেকেই কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেল সরবরাহে সংকট সৃষ্টি করে রেখেছিল; যা এখনও বিদ্যমান। সরবরাহে ঘাটতি না না থাকা স্বত্ত্বেও সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না। কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তাও জানি না। বাজারে ভোজ্যতেলের অস্থিরতা কাটছেই না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের পরিচালক অমিতাভ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহে কোনও জটিলতা নাই। আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। তবে সরকার যদি ভোজতেলে দেওয়া শুল্ক রেয়াতি সুবিধা ৩১ মার্চের পর না দেয়, তাহলে তো আমাদের বেশি শুল্ক ও ভ্যাট দিয়ে আমদানি করতে হবে, তখন তো দাম বাড়বেই। এ কারণেই মিলারদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে দাম বাড়ানোর একটা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাকিটা সরকারের সিদ্ধান্ত।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, ভোজ্যতেলে দেওয়া শুল্ক ও কর রেয়াতি সুবিধা যেভাবে আছে সেভাবেই ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলবে। ৩১ মার্চের পরে এ সুবিধা অব্যাহত থাকবে কিনা সে বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
উল্লেখ্য, দেশে প্রতিবছর ভোজ্যতেলের চাহিদা ২৩ থেকে ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে আড়াই লাখ টন তেল দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি ২০ থেকে ২১ লাখ টন ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে রমজান মাসে চাহিদা থাকে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টন।