Homeসাহিত্যকুসুম আলোয় সাতটা কুকুর

কুসুম আলোয় সাতটা কুকুর


এক.
ওর নাম জাদা। কেউ বলে নবাবজাদা। আবার, কেউ বলে হারামজাদা। লম্বা খাড়া নাক। নাকের দুটো ফুটোর নিচে ছোট্ট একটুকরো গোঁফ। মেদহীন ছিপছিপে শরীর। উচ্চতা পাঁচ ফুটের বেশি নয়। চেহারা হিটলারের রেপ্লিকা বলে মনে হয়।
কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী নবাব ছিল নিঃসন্তান। টাকার বিনিময়ে কোনো হাসপাতাল থেকে একটা সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু এনেছিল এই দম্পতি। সেই শিশুই আজকের জাদা।
রেলকলোনির পাশে ছোট ছোট খুপরি ঘর। রাতদিন দরজা বন্ধ থাকে। রেললাইনের দিকে একটা করে ছোট জানালা আছে। শ্রমিকরা কাঁচা চামড়ায় লবণ লাগায়। অনেকে বলে লবণঘর। একদম মাঝের ছয় ফুট বাই আট ফুট ঘরটাকে বলে গদিঘর।

তোশকের ওপর বসে থাকে মালিক। অর্থাৎ জাদার পিতা। কড়া মেজাজের মানুষ। কাজের ফাঁকি সহ্য করতে পারে না। বেলা দুইটার দিকে ডাউন ট্রেন আসে।
মাটি কাঁপিয়ে হুইসেল দিতে দিতে দূরে মিলিয়ে যায়। জানালায় ট্রেনের যাত্রা দেখতে অপরূপ লাগে। শ্রমিকরা হুমড়ি খেয়ে ট্রেন দেখতে ছুটে যায়। কিছুটা একঘেয়েমি কাটাতে চায়। মালিক হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘণ্টা বাজাতে থাকে।
: এই শুয়োরের দল, হাত চলে না কেন? বেতন কাটা পড়বে। সাবধান!
ঘণ্টা বাজানোর মাজেজা শ্রমিকরা জানে। বেতন কাটার ভয়ে জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। কাজে হাত লাগায়। শেষ রাতে ট্রাক আসবে। কাঁচা চামড়া লোড করে রাজধানীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। চামড়ার ব্যবসা থেকে জাদার পিতা অনেক টাকার মালিক হয়েছে। একমাত্র পালিত ছেলে জাদা। তবে, এখন আর পালিত সন্তান বলা যায় না। কারণ, আপন সন্তানের মতোই জাদা লালিত পালিত হয়েছে। জাদাকে লেখাপড়ার জন্য সব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শহরের সবচেয়ে নামকরা শিক্ষক ছিল জাদার প্রাইভেট টিউটর। জাদা নিজেও মেধাবী ছাত্র ছিল। ফলে, প্রতিটি ক্লাসে সে ফার্স্ট হয়েছে। জাদার পড়ার টেবিলে, আলমারিতে শত শত বই। বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী, রাজনৈতিক বই, ছিল বিভিন্ন ধর্মতত্ত্বের বই। কলেজে ছাত্রনেতারা শহিদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে বক্তৃতা করে। জাদা তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে চেষ্টা করে। জাদার কাছে তাদের বক্তৃতাকে হাস্যকর মনে হয়। কারণ, নেতারা লেখাপড়ায় দুর্বল। গভীর জ্ঞান নেই। নির্বোধ। তারা শুধু হাততালি প্রত্যাশা করে। এক পাতি ছাত্রনেতার সাথে জাদা বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। সেই নেতার নির্দেশে আট-দশজন পার্টিক্যাডার জাদাকে বেদম মারধর করে। হাসপাতালে থাকতে হয় অনেক দিন।

শহরের সবচেয়ে দামি বিল্ডিংবাড়ি একজন মন্ত্রীর। মন্ত্রীর ডান পা একটু খাটো। ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটেন। সামনে পিছে অন্তত চার ডজন গাড়ি নিয়ে নিজ শহরে আসেন। কয়েকশ লোকের জটলা থাকে বাড়ির প্রাঙ্গণে। মন্ত্রী যখন কথা বলেন, তখন কেউ টু শব্দটি করে না। সবাই পুতুলের মতো নিশ্চল থাকে। জাদা মন্ত্রীর বাড়িতে বেশ কয়েকবার গিয়েছে। একবার মন্ত্রী তাকে পাশে বসতে দিয়েছিল।
: জাদা, তোমার বাবা কিন্তু আমার বন্ধু। একসাথে কত ফুটবল খেলেছি। তোমার মতো মেধাবী মানুষেরা কেন পড়ে থাকবে? আমি তোমাকে আমার আদর্শের ছায়ায় দেখতে চাই। আমার পাশে থেকে জনগণের মুক্তির জন্য কাজ করবে। আমার সরকার দেশকে ইউরোপের মতো উন্নত দেশ বানাতে চায়। তবে, বিরোধী দল সেটা চায় না। 
জাদা মন্ত্রীর মিথ্যাচার বুঝতে পারে। এক পা খাটো থাকার ফলে, মন্ত্রী কোনোদিন ফুটবল খেলার কাছেও যায়নি। জনগণের মুক্তি কীভাবে আসবে, তার কোনো লজিক্যাল পথ এই পার্টি দেখায়নি। জনগণের কাছে শুধুই মিথ্যাচার।
জাদা এটাও বুঝেছে যে, জনগণ মিথ্যাকে সহজেই গ্রহণ করে। তারা মিথ্যাবাদীকে মহানায়ক বানায়। মন্ত্রীর কাছে খবর যায়—ছেলেটা তার সমালোচনা করছে। পথের কাঁটা হবে একদিন। শেষ রাতে পুলিশ জাদাকে ধরে নিয়ে যায়। রিমান্ড চাওয়া হয়। প্রায় তিন মাস পর জেল থেকে ছাড়া পায়।

দুই.
জাদা একজন বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী ষাটোর্ধ্ব মানুষকে চিনত। নাম অনীল সেন। সাদা চুল। মুখ ভরতি দাড়ি-গোঁফ। তিনি জনযুদ্ধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। স্বপ্ন দেখেন। একদিন গ্রামের মানুষ দল বেঁধে এসে শহরকে ঘিরে ফেলবে। পার্টির শুদ্ধি লাইন অর্থাৎ খতম লাইনে অগাধ বিশ্বাস।
জাদা তার কাছে উৎপাদন বিষয়ে কোনো সঠিক চিন্তা বা দর্শন পায়নি। অনীল সেন জাদাকে তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড সশস্ত্র দলে যোগ দিতে তাগাদা দেয়।
জাদা সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। তার ফল জাদা পেয়েছিল। জাদাকে একদল লোক তুলে নিয়ে যায়। মুক্তিপণ হিসেবে অনেক টাকা দাবি করে। জাদার ম্যানেজার অপহরণকারীদের টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। তখন জাদার পালক পিতা বেঁচে ছিল না।
জাদা কোনো আদর্শ খুঁজে পায় না। প্রতিটি নেতা, পাতি নেতা, সবাই প্রতারক। শুদ্ধ ফিলোসফি তাদের নেই। তারা জাদাকে কিছু দিতে পারেনি। বরং, জাদাকে অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। পৃথিবীর অন্যান্য গ্রেট ম্যানদের মতো জাদা নিজেকেও গ্রেট ম্যান হিসেবে দেখতে চায়। মানুষ তাকে একমাত্র নেতা হিসেবে চিনুক। তাকে স্মরণ করুক। সেটা জাদা প্রত্যাশা করে। কিন্তু তার জন্য সরল পথগুলো খোলা ছিল না। এভাবে জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। জাদা বুঝতে পেরেছে, সৎ এবং বুদ্ধিমান মানুষের থেকে পাগলা কুকুরকে মানুষ বেশি মনে রাখে। পথ করে দেয়।
আজ একজন মুসলিম ধর্মীয় নেতার সাথে জাদার সাক্ষাৎ ছিল। এই মানুষটি শহরের মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত সম্মানীয়। ধবধবে সাদা পোশাক। সৌম্য চেহারা। নরম স্বরে কথা বলেন। মেঝেতে দুজন মুখোমুখি বসা।
: আপনি একজন আলেম মানুষ। আপনি আমাকে বলুন, মুসলিমদের মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি কেন?
: কারণ, তারা পরকালে সব পাবে। এখানে নয়।
: দুনিয়া এবং পরকাল সব স্থানেই বিজয়ী হওয়ার কথা ইসলামে নেই?
: না, সম্ভব নয়। এই দুনিয়া হলো দুঃখ কষ্টের জায়গা। পরীক্ষার জায়গা।
এখানে সফলতা নেই।
: তাহলে, সব পির সাহেবদের এত টাকাপয়সা কেন? এই শহরে আপনার আটটি বাড়ি কেন? হিন্দুদের বিষয়ে আপনার মতামত কী?
: বুঝছি, তুমি আমারে ধরতে আসছ। 
জাদা চলে আসে। সঠিক উত্তর পায় না। কিন্তু এই ধরনের আলেমদের তো মানুষ পছন্দ করে। কেন করে, জাদা তার গভীরে পৌঁছাতে চায়।
পরের দিন জাদা একজন হিন্দু ধর্মীয় গুরুর সাথে সাক্ষাৎ করে। গুরুর শিষ্য সংখ্যা অনেক। ভক্তরা গুরুকে একজন দিব্যজ্ঞানী মানুষ মনে করে। লাল গেরুয়ায় বেশ রাশভারি দেখাচ্ছিল। জাদা এবার গুরুকে প্রশ্ন করে।
: গুরু, ধর্মের মূল কাজ কী?
: ঈশ্বর বন্দনা। এই দেহ ব্রহ্মাণ্ড শুধুই ঈশ্বরের জপমালা। আর কোনো কাজ নেই।
: তাহলে মানুষ কোথায়? মানুষের ভালো-মন্দ কোথায়?
: মানুষ অনিত্য। কিন্তু ঈশ্বর নিত্য। তার কোনো বিনাশ নেই। মানুষ দুঃখ ভোগ করে স্বর্গের জন্য। আমি দেবতার প্রতিনিধি। স্বর্গের পথ আমিই দেখাই।
: আপনার আয়েশি জীবন কেন? এত অর্থবিত্ত? মুসলিমদের সম্বন্ধে আপনার মতামত কি?
: ভক্তরা দেয়। আমি কৃপা করি। আমি ঈশ্বরের মুখ থেকে উদ্ভূত। শ্রম বিক্রি আমার কাজ নয়। 

তিন. 
জাদা কোথাও প্রকৃত সত্যের সন্ধান পায় না। তবে, একটা বিষয় সে লক্ষ্য করেছে, দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে ধর্ম চেতনা প্রবল।
রেলস্টেশনের পাশে এই ছোট শহরটিতে মানুষের বসতি অনেকাংশে কম। কিছু মানুষ চাল কলে কাজ করে। কাঁচা চামড়ার কারখানায় কাজ করে। কিছু মানুষের কাজ আছে, কিন্তু অনাহার পীড়িত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। স্বর্ণকার পট্টি, মুদি পট্টি, কামার পট্টিসহ শহরের উত্তর দিকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি। শহরের দক্ষিণদিকে মুসলমানদের বসবাস বলা চলে। তবে হিন্দু-মুসলিম বসবাস পুরোপুরি ভাগবণ্টন হিসেবে নেই। অনেক স্থানেই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি যুগ যুগ ধরে বসবাস করছে। একে অপরের শত্রু হিসেবে কোনোদিন কেউ মনে করে না। সামাজিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক এখানে চমৎকার।
প্রকৃতিও ভেদাভেদ করে না। পাখিরা হিন্দুদের গাছে বসে। গান গায়। মুসলমানের গাছে বসে। গান গায়। বসন্তে হিন্দুদের গাছেও ফুল ফোটে। মুসলমানের গাছেও ফুল ফোটে। বিভেদ, অসাম্যতা মানুষের তৈরি।
জাদা শহরের গরিব মানুষদের সাহায্যের জন্য বিনা সুদে ঋণ দিয়েছিল। কেউ ফেরত দেয়নি। চামড়ার ব্যবসা সরকারদলীয় একজন নেতা দখল করে নিয়েছে। বাড়ি দখল করেছে বিরোধী দলের নেতা। কোথাও বিচার পায়নি। এখন একটা হোটেলে রাত কাটায়। হাতে কিছু টাকা আছে। ছয়জন খুনিকে টাকা দিয়ে জেল থেকে জামিন করিয়েছে সে। তারা সবসময় তার সাথে থাকে। বেতন নেয়।
জাদার পরামর্শ অনুসারে কাজ করে। জাদা প্রতিশোধ নিতে চায়। সে ভাবে, এই শহর মানুষের লোভ আর ভণ্ডামিতে ভরে আছে। সব মানুষকে ব্যাকস্পেস বাটন দিয়ে মুছে দিতে হবে। তারপর রিসেট।

আপরাইজিংয়ের বাতাস এদিকেও আসছে। তার ছয়জন সঙ্গীকে নিয়ে এ-প্লান, বি-প্লান বুঝিয়ে দেয়। গভীর কালো রাতের অপেক্ষায় থাকে সাতজন। রাত আসে।
হিন্দুদের প্রধান ৩টি মন্দির দাউ দাউ করে জ্বলছে। জ্বলছে বড় মসজিদসহ তিনটি মসজিদ। হিন্দু-মুসলমান কাছাকাছি বসবাস করলেও ধর্মের আঘাত সহ্য করা যায় না। হানাহানি শুরু হয়েছে। তথাকথিত ধর্ম নয়, মরছে মানুষ।
শহরময় কান্নার রোল। পুলিশ পালিয়েছে। শহরের পাশের ছোট নদীটির পানি বা জল, এখন রক্তবর্ণ। অনেকগুলো লাশ ভেসে যাচ্ছে। লাশেদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। শহরের আগুন থামানোর কোনো মানুষ নেই। শিশুদের নিয়ে, পরিজন নিয়ে শহর ছেড়েছে শত শত মানুষ। জাদার পরিকল্পনা কাজ করেছে। জাদা এবং তার পোষ্য খুনিরা শহর ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে। তারা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে।

রাত শেষ প্রহর। জাদা হাঁপাতে হাঁপাতে একটা নদীর ধারে এসে বসল। নদীটি শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। জাদার সমস্ত মুখে রক্তের প্রলেপ। এই নদীর পানি বেশ স্বচ্ছ। মুখ ধুতে হবে। জাদা দেখল, তার থেকে কিছুটা দূরে দুই দিকেই তিনটা করে মোট ছয়টা কুকুর পানিতে হামাগুড়ি দিল। তাদের লোমগুলো, মুখমণ্ডল রক্তে ভরা। তারা লেজ নাড়তে পারছে না। কারণ, লেজগুলো রক্তে ছোপানো। ভয়ংকর। কুকুরদের দিকে তাকানো যায় না।
সূর্যের রক্তিম আভা মিলিয়ে হালকা কুসুম আলো পড়েছে নদীর জলের ওপর। দুই হাতে আঁজলা ভরে পানি তুলতে গিয়ে জাদা ফিরে এলো। তার মুখের ছায়া পড়েছে জলের ওপর। কিন্তু জাদা নিজের মুখটা দেখতে পেল না। দেখল একটা কুকুরের মুখ ভাসছে স্বচ্ছ নদীর জলের ওপর। তার দুই পাশে তখনও ছয়টি কুকুর তার দিকে তাকিয়ে আছে।





Source link

এই বিষয়ের আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

এই বিষয়ে সর্বাধিক পঠিত