দাম বৃদ্ধি তো দূরের কথা উল্টো দাম কমানোর জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিইআরসিকে অনুরোধ করল ব্যবসায়ীরা। গ্যাস খাতের দুর্নীতি এবং সিস্টেম লস কমিয়ে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে একযোগে দেশের সকল শিশু ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো। এই প্রথম বাংলাদেশ এনার্জি কোরেটারির কমিশনের গ্যাসের দাম বৃদ্ধির শুনানিতে এফবিসিবিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, স্টিল, সিরামিকসহ দেশের সবগুলো সংগঠনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
শিল্পী গ্যাসের দাম ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৭৫ টাকা করার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন ব্যবসায়ীরা। তারা দাবি করেন এতে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান বিকশিত হবে না। কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে বৈদেশিক আয়ও কমে যাবে। এই পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে।
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিয়াম অডিটোরিয়ামে শিল্প ও ক্যাপটিভ শ্রেণিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর শুনানি আয়োজন করে তোপের মুখে পড়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। শুনানি ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন।
তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাসের উপর নির্ভর করে এই খাত আজকে অনেক উপরে উঠে এসেছে। গতবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর সময় বলা হয়েছিল আমরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাবো। সেই গ্যাস কিন্তু আমরা পাইনি আজও। এরমধ্যে আবারও গ্যাসের দাম দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধির প্রস্তাব কোম্পানিগুলো কীভাবে দেয় সেটাই এখন ভাবার বিষয়৷ দাম বৃদ্ধি না করে কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস কমিয়ে আনা গেলেই খরচ অনেকখানি কমে আসে। গ্যাস চুরি বন্ধ না করে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার নিয়ে আমাদের উপর চাপ দেয়া হচ্ছে৷ এ রকম এক পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব অযৌক্তিক, অবাস্তব।
বিজিএমইএ এর সহসভাপতি আসিফ আশরাফ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে গেলে যে লজিস্টিক সাপোর্ট দরকার তাই তো কোম্পানিগুলোর নেই। অথচ বার বার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসে দেবেন আর দাম বাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এইভাবে চলতে পারে না। তিনি বলেন, এমনিতেই আমাদের দেশে এখন বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো না। এরপর যদি আমাদের মুলখাতগুলোকে বিপদের মধ্যে পড়ে তাহলে দেশে অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে।
ব্যারিস্টার তানিম হোসেন বলেন, এই প্রস্তাব গ্যাস আইনের পরিপন্থি। গ্যাস আইন এবং সংবিধান কোনোটাই এই প্রস্তাব সমর্থন করে না। বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব প্রত্যাখান করে কমিশনের উচিত প্রস্তাব পুনঃ মূল্যায়ন করা।
বিজিএমইর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরি (পারভেজ) বলেন, গত কয়েকবছরে আমাদের বিদেশি বিনিয়োগ আসা শুরু হয়েছিল। এইভাবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হলে কারখানাগুলো রুগ্ণ হয়ে যাবে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে আমাদের এমনিতেই উৎপাদন কমে যাচ্ছে।এইভাবে চলতে থাকলে পুরো দেশটা আমদানি নির্ভর হয়ে পড়বে। আমাদের উৎপাদন বাড়াতে হলে দাম না বৃদ্ধি করে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতির মইনুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি আগে নিজেদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়ার সক্ষমতা দেখান। এমনভাবে পরিকল্পনা করেন যাতে আমাদের আমদানি করে আর চলতে না হয়। এই দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে৷ এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে গ্যাসে দাম কমিয়ে বরং সরবরাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি জাহাঙ্গির আলম বলেন, শিল্পের স্বার্থে, কর্মসংস্থানের স্বার্থে আগের বার যে ৩০০ ভাগ দাম বাড়ানো হয়েছিল তা কমিয়ে ২০ থেকে ২২ টাকায় নামিয়ে আনেন। সে সময় আপনাদের বাদ দিয়েই সরকার দাম বাড়িয়েছিল। এখন আপনাদের হাতে সব। আপনারা চাইলে দাম কমিয়ে আনতে পারেন।
সাবেক সিএনজি মালিক সমিতির নেতা জাকির হোসেন নয়ন বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলো যে প্রস্তাব দিয়েছিল তাতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিছু বলা হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো কমিশনের মূল্যায়ন কমিটিও এর বিরূপ প্রভাব নিয়ে একটা লাইনও লিখেননি। তারা শুধুও কোম্পানিগুলর লাভ নিয়ে ভাবলেন। অথচ রেগুলেটরি বডি হিসেবে গ্রাহকদের দিকটাও তাদের দেখার কথা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে নানান জায়গায় যে ভ্যাট বসিয়েছেন এসব বন্ধ করেন। এতেই লোকসান কিছুটা কমে আসবে। এখন যে দাম আছে ৩০ টাকা তাও আমাদের জন্য বেশি। এটি মূল্যায়ন করে কমিয়ে আনা দরকার।
সিএনজি মালিক সমিতির মহাসচিব ফারহান নুর বলেন, লাইসেন্সি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের দিকটা বিবেচনা করার অনুরোধ। লোকসান দিয়ে আর ব্যবসা করা যাচ্ছে না।
ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টারস বাংলাদেশের (এফইআরবি) নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম বলেন, বিইআরসি চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন স্বল্প সময়ের জন্য হলেও আপনারা জাতিকে সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। এখন অন্তত মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলার ডেসক্রিপশন মেনে কাজ করা বন্ধ করুন। তিনি বলেন স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন হয়ে কাজ করলে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কোনো প্রয়োজন পড়বে না।
সবশেষে চেয়ারম্যান বলেন, আপনার যে-সব যুক্তি তুলে ধরেছেন এসব বিষয় আমরা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, জ্বালানির আমদানির যাতে বাড়াতে না হয় সেদিকে পেট্রো বাংলাকে সতর্ক হতে হবে। কমিশন সবার বক্তব্য শুনেছে। এখন আমরা বিশ্লেষণে বসবো। খুব শিগগির একটা সন্তোষজনক সমাধান দিতে পারবো বলে আশা করছি।
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন,পলিসি এক্সচেঞ্জের হাসনাত আলম, গণ সংগতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ।