একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে বাধা পেয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বসে পড়েছিলেন—এই দাবিতে একটি কোলাজ ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি দুটি বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপে প্রায় একই ক্যাপশনে ছড়ানো হয়েছে। ছবিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জনসমাগমের মধ্যে রাস্তার ধারে পাঞ্জাবি ও পায়জামা পরা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। তাঁর পাঞ্জাবির বাঁ দিকে শহীদ মিনারের একটি মনোগ্রাম দেখা গিয়েছে।
‘বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টা ৩৭ মিনিটে প্রকাশিত পোস্টটি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা, ‘বিএনপির অবস্থা এতই খারাপ হয়েছে যে তাদের দলের মহাসচিব এর আজকে এই ভাবে শহীদ মিনার এর গেটের সামনে এভাবে থাকা লাগে’ (বানান অপরিবর্তিত)
আজ শনিবার দুপুর ২টায় এই পোস্টে ১ হাজার ৪০০ রিঅ্যাকশন পড়েছে এবং শেয়ার হয়েছে ৪০৫। এ ছাড়া পোস্টটিতে ১৪১টি কমেন্ট পড়েছে। এসব কমেন্টে ছবিটি পুরোনো বলে উল্লেখ করেছেন। আবার অনেকে ছবিটি গতকাল শুক্রবারের (২১ ফেব্রুয়ারি) মনে করে কমেন্ট করেছেন। ‘R Haider Babul’, নামের অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়েছে ‘সত্যিই এটা খুবই দুঃখজনক। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক নেতাদের জন্যই দুঃখজনক। (বানান অপরিবর্তিত) ‘Mostafizur Rahman’ লিখেছে, ‘খুবই দুঃখজনক ব্যাপার।’ (বানান অপরিবর্তিত)
‘Barrister Johirul Islam’ নামের ফেসবুক পেজ, ‘আমরা মুজিবের সৌনিক’ এবং ‘Sirajul Islam’ নামের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় একই ক্যাপশনে ছবিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে।
ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হলে Dibakar Rajbongshy নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ভিন্ন দিক থেকে তোলা একই ছবি পাওয়া যায়। ছবিগুলো ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হয়। এসব ছবির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পরনে থাকা পাঞ্জাবি-পায়জামা এবং বুকে থাকা মনোগ্রামের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।

ক্যাপশনে লেখা, ‘জাতীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে হটাৎ দেখা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির এর সাথে।’ (বানান অপরিবর্তিত)
একই সার্চে Shanbe Ahmed Babu নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ছবি দুটি পাওয়া যায়।
তবে এই পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়, সে সময়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শহীদ মিনারে ঢুকতে বাধা দেয়। তাই তিনি তখন রাস্তার পাশে বসেছিলেন।
সে সময়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শহীদ মিনারে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল কি না, তা জানতে গুগলে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করা হলে যুগান্তরে ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সে সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির অন্য নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। যুগান্তরের এই প্রতিবেদনে থাকা ছবির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পোশাক ও বুকে থাকা মনোগ্রামের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ধ্বংস করা হয়েছে। মানুষের অধিকার ও ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে এমন এক সময় এ দিবস পালন করতে হচ্ছে, যখন দেশে কোনো গণতন্ত্র নেই।’
তবে এই প্রতিবেদনের কোথাও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শহীদ মিনারে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেননি। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
গতকাল শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শহীদ মিনারে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক বিভাগ। এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে সংবাদ সংস্থা ইউএনবির একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২১ ফেব্রুয়ারি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
আরও জানা যায়, পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, কেন্দ্রীয় নেতা নাজিম উদ্দিন আলম, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি আমিনুল হক, যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
এটিএন বাংলা, যমুনা টেলিভিশন, নিউজ টুয়েন্টিফোরসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম থেকে একই তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব প্রতিবেদনে গতকাল শুক্রবার পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রবেশে বাধা প্রদানের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, গতকাল শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উপস্থিত ছিলেন না এবং শহীদ মিনারে প্রবেশে বাধা প্রদানের তথ্যটি মিথ্যা। প্রকৃতপক্ষে, ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাস্তার পাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বসে থাকা অবস্থার ছবি গতকাল (২১ ফেব্রুয়ারি) পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রবেশের সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাধা প্রদান করা হয়েছে দাবিতে ছড়িয়েছে।