Homeঅর্থনীতিসংযোগ ফি দিয়ে অপেক্ষায় ৫৫৫ শিল্পপ্রতিষ্ঠান: গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধে বিপদে মালিকরা

সংযোগ ফি দিয়ে অপেক্ষায় ৫৫৫ শিল্পপ্রতিষ্ঠান: গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধে বিপদে মালিকরা

হঠাৎ করে দেশের সব ধরনের শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। গত সপ্তাহে জ্বালানি বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে দেশের সব বিতরণ কোম্পানিকে এই নির্দেশনা পাঠানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের গ্যাস ফিল্ডগুলোতে উৎপাদন ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে এবং দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ কারণে শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়টি আপাতত বিবেচনা করা হচ্ছে না। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে চরম উৎকণ্ঠায় পড়েছেন শিল্পমালিকরা, বিশেষ করে যারা ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে সংযোগের জন্য অপেক্ষায় আছেন।

জানা গেছে, উত্তরবঙ্গের দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান—কিএমএসএস এবং স্কয়ারের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্যাস সংযোগ দিতে জ্বালানি বিভাগের অনুমতি চেয়েছিল পশ্চিমাঞ্চলガス বিতরণ কোম্পানি। এর জবাবে গত ১৪ জুলাই জ্বালানি বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, দেশে নতুন কোনো শিল্প গ্রাহককে গ্যাস সংযোগ দেওয়া যাবে না। কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এই নির্দেশনা ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে বসে থাকা প্রতিশ্রুত সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মুনির হোসেন চৌধুরী জানান, এই সিদ্ধান্তটি সাময়িক; বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি পেলে বা দেশে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে শিল্পে আবার গ্যাস দেওয়া হবে।

আটকে আছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

বিনিয়োগকারী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের জন্য বড় আঘাত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরকারি ঘোষণার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক।

বর্তমানে দেশের ৬টি বিতরণ কোম্পানিতে নতুন শিল্প সংযোগের জন্য ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন জমা হয়ে আছে। এর মধ্যে ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সংযোগের টাকা জমা দিয়ে বসে আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েছেন মালিকরা। কারখানা চালু না হওয়ায় তারা উৎপাদনে যেতে পারছেন না, অথচ প্রতি মাসে তাদের ব্যাংকের চড়া সুদ গুনতে হচ্ছে।

চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যারা অবকাঠামো তৈরি করেছেন, গ্যাস না পেলে তারা পথে বসে যাবেন। গ্যাসের দাম ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করার পরও যদি গ্যাস না পাওয়া যায়, তবে দেশ এগোবে কীভাবে।

শিল্পমালিকদের হাহাকার ও লোকসানের বোঝা

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জালালাবাদ গ্যাস এলাকায় ১৭টি শিল্পকারখানা ও ক্যাপটিভ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল সর্বশেষ সংযোগ। সেই তালিকায় সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনের পারিবারিক আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান থাকলেও অন্য বড় গ্রুপগুলো এই সুবিধা পায়নি।

হবিগঞ্জ এলাকায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। এক শিল্পমালিক জানান, বিদেশি ক্রেতা ধরে রাখতে তিনি দৈনিক ৩ লাখ টাকার এলপিজি কিনে লোকসান দিয়ে ফ্যাক্টরি চালু রাখছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “গ্যাস সংযোগের নিশ্চয়তা পেয়ে ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানা করলাম, এখন গ্যাস না দিলে ঋণের কিস্তি কি সরকার দেবে?”

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দেওয়ার পরও গ্যাসের অভাবে তাঁর ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান অলস বসে আছে। একই ক্ষোভ প্রকাশ করে টিকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, গ্যাসের অভাবে তাঁর ৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চালু করতে না পেরে তিনি ব্যাংক ঋণ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।

ডুবতে বসা শিল্প খাত ও উৎপাদন বিপর্যয়

দেশে বর্তমানে গ্যাসনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৬ হাজারেরও বেশি, যার মধ্যে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতাতেই আছে ৫ হাজার ৬৭৩টি। গ্যাস সংকটের কারণে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, টাঙ্গাইল ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার শিল্পকারখানার উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।

দেশের অন্যতম বৃহৎ গার্মেন্টস গ্রুপ স্ট্যান্ডার্ড এজেন্সির সিনিয়র ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজার নজরুল ইসলাম জানান, গ্যাসের অভাবে ক্যাপটিভ ও বয়লার চালানো যাচ্ছে না। ২৩ হাজার শ্রমিকের এই ফ্যাক্টরি চালু রাখতে দৈনিক ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার ডিজেল কিনতে হচ্ছে। শুধু জুনেই তাদের ডিজেল বিল এসেছে ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা। এভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কতদিন কারখানা চালানো সম্ভব তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

হ্রাস পাচ্ছে সরবরাহ, এলএনজিতে ধীরগতি

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২১ সালে শিল্পে ৪ হাজার ৩৩০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস দেওয়া হলেও ২০২৫ সালে তা কমে ৩ হাজার ৭৩৪ মিলিয়ন কিউবিক মিটারে নেমে এসেছে। গত বছর দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এখন তা ২৬০ কোটিতে নেমেছে। পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্থানীয় খনিগুলো থেকে প্রতি বছর দেড় কোটি ঘনফুট করে উৎপাদন কমায় আগামী বছর সরবরাহ ২৫৫ কোটিতে নেমে আসতে পারে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতির মধ্যেও নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসিয়ে গ্যাস আমদানির বিষয়ে বর্তমান সরকার গত ৫ মাসেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ফলে ঢাকার বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এবং তীব্র গ্যাস সংকটের দ্বিমুখী চাপে দেশের পুরো শিল্প খাত এখন ধ্বংসের মুখে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য