Homeজাতীয়সরকার চায় রাষ্ট্রের ব্যয় কমাতে: এয়ারশো দেখতে বিদেশে বিমানের শীর্ষ ৫ কর্তা

সরকার চায় রাষ্ট্রের ব্যয় কমাতে: এয়ারশো দেখতে বিদেশে বিমানের শীর্ষ ৫ কর্তা

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। তবে সরকারের সেই কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও নির্দেশনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) পাঁচজন শীর্ষ কর্মকর্তা একটি এয়ারশোতে অংশ নিতে সরকারি খরচে যুক্তরাজ্য সফরে গিয়েছেন। সাত দিনের এই প্রমোদভ্রমণ সদৃশ সফরে রাষ্ট্রের ব্যয় হচ্ছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা, যা নিয়ে এখন খোদ বিমান প্রশাসন ও এভিয়েশন খাতে তীব্র সমালোচনা ও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক ডলার সংকট ও রিজার্ভের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে আন্তর্জাতিক এয়ারশোতে এত বড় প্রতিনিধিদল পাঠানোর পেছনে রাষ্ট্রের কী অর্জন হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। এই সফর থেকে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর কিংবা বাণিজ্যিক কোনো সুবিধা অর্জিত না হলে জনগণের অর্থের এই অপচয়ের দায় কার, সেই প্রশ্নও তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারি নির্দেশনার প্রকাশ্য লঙ্ঘন

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৬ এপ্রিল সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফর কঠোরভাবে সীমিত করার নির্দেশনা জারি করে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘একান্ত অপরিহার্য কারণ’ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর কোনোভাবেই অনুমোদন করা যাবে না। এরপর গত ৮ জুলাই অর্থ বিভাগ আরও কঠোর পরিপত্র জারি করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের সব ধরনের বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করে।

অথচ এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারির পরপরই, গত ১৩ ও ১৬ জুলাই বিমানের দুটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে এই পাঁচ কর্মকর্তার যুক্তরাজ্য সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত চলমান এই সফরে কর্মকর্তাদের বিজনেস ক্লাসের বিমান ভাড়া, পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থান, দৈনিক ভাতা (ডিএ) এবং স্থানীয় যাতায়াতসহ সব খরচ বহন করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

সফরকারী কর্মকর্তারা হলেন:

  • কাইজার সোহেল আহমেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও
  • কাপ্তেন একেএম আমিনুল ইসলাম, পরিচালক (ফ্লাইট অপারেশনস)
  • এয়ার কমোডর মো. মনজুর ই আলম, পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট)
  • এম মাসুদুর রহমান, পরিচালক (করপোরেট প্ল্যানিং অ্যান্ড ট্রেনিং)
  • কাপ্তেন শেখ আব্বাস হোসেন, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (করপোরেট প্ল্যানিং)

চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রমোদভ্রমণের অভিযোগ

বিমানের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, চলতি বছরের এপ্রিলেই যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে বিমানের নতুন উড়োজাহাজ কেনার মূল চুক্তি সম্পন্ন হয়ে গেছে। ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের ‘ফার্নবরো আন্তর্জাতিক এয়ারশো-২০২৬’-এ করপোরেট প্ল্যানিং ও ফ্লাইট অপারেশনস বিভাগ থেকে একসঙ্গে এতজন শীর্ষ কর্মকর্তার উপস্থিতি কোনোভাবেই ‘অপরিহার্য’ ছিল না। এটি মূলত কর্মকর্তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে এক ধরনের ‘পেইড হলিডে’ বা আনন্দভ্রমণ।

তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ বিশেষজ্ঞদের

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “এয়ারশোতে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও অর্জনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। অতীতেও বিমানের কর্মকর্তারা প্যারিস ও ফার্নবরো এয়ারশোতে অংশ নিয়েছেন। তবে সেসব সফর থেকে সেবার মান উন্নয়ন, উড়োজাহাজ সংগ্রহ বা রক্ষণাবেক্ষণে দেশ কী সুবিধা পেয়েছে, তা কেউ জানে না। দৃশ্যমান কোনো অর্জন না থাকলে এ ধরনের সফর সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।”

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এটি সরকারের ঘোষিত ব্যয় সংকোচন নীতির স্পষ্ট পরিপন্থী। যেখানে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো হচ্ছে, সেখানে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও প্রয়োজনীয়তা ছাড়া জনগণের অর্থ এভাবে অপচয় করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”

কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি লঙ্ঘন করে কে এই বিশাল প্রতিনিধিদলের বিদেশ সফরের অনুমোদন দিল—তা জানতে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে কেউ মুখ খোলেননি।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য