১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে সংগঠিত আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি লেখেন, এ কথা সবার জানা। তবে ইংরেজদের বঙ্গভঙ্গের মূল নকশায় জোরালো পরিকল্পনা ছিল বঙ্গকে কেবল ভাগ করা নয়, বরং পুরোপুরি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করা। ১৯০৩ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রথম যে প্রস্তাবসমূহ বিবেচনা করা হয়, সেখানে বঙ্গ থেকে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাদুটিকে আসাম প্রদেশে অন্তর্ভুক্ত করার বিশেষ প্রস্তাবও ছিল (বাংলাপিডিয়া, অধ্যায়- বঙ্গভঙ্গ)। সুতরাং এভাবে গড়ে ওঠা একটি অঞ্চল চূর্ণ করার পরিকল্পনা, প্রথম ধাপেই তা পুরোপুরি সফল করতে না পারা এবং একইসঙ্গে ইংরেজদের বিভাজন-নীতির দিকে তাকালে প্রবলভাবে স্পষ্ট হবে বাঙলাভাষী মানুষেরা যে অঞ্চলের মাটি, আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠে, তার ভূগোল এবং জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা। একটি অঞ্চলকে শাসন করতে কখন সেটা ভাগ করা আবশ্যিক হয়ে ওঠে, এই প্রশ্ন তুললেই সাদা চোখে তার সম্ভাবনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে।
পৃথিবীর যে প্রান্তের মানুষই হোক না কেন, সে যদি তার মাতৃভাষায় কাউকে কথা বলতে শোনে, কোনো ভাবনা ছাড়াই, অবলীলায় লোকটিকে আপন মনে করে নেবে। সে কোন মতের কিংবা কোন আদর্শের সেসব কথা ভাববে কিছু পরে। মানুষের স্বাভাবিকতা এমনই। একইভাবে, অরাজনৈতিক এবং খাঁটি অনুভূতির স্ফুরণ থেকে অবচেতন মনে কোনো বাঙলাভাষী চাইবে না তার অঞ্চলটিকে ছিন্ন-ভিন্ন করা হোক। ঠিক এ-রকম একটি না-চাওয়া থেকে সাধারণ মানুষ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে তখন যে আন্দোলন করে, তার সারবত্তার প্রধান অংশ হয়ে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি। রবীন্দ্রনাথ লেখার কারণে গানটি যে সহজে জনসম্মুখে এসেছে, সে কথা অনস্বীকার্য; তবে বাঙলাভাষী মানুষের কাছের গানটি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল সমাজে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের গ্রহণযোগ্যতার কারণে নয়, বরং গানটির ভেতরে ব্যবহৃত শব্দাবলি মাতৃভূমি বিষয়ে যে আবেশ, যে নস্টালজিয়া বাঙলাভাষীর বুকের ভেতরে ছড়িয়ে দেয়, মূলত সে কারণেই। গানটির প্রতিটি পরতে পরতে সকল বাঙলাভাষীর মাতৃভূমির সঙ্গে আকুলতা ঐকতানে গিয়ে পৌঁছায়। এই একই কারণে সময়ে সময়ে অবাঙলাভাষী শাসকের কাছে গানটি হয়ে উঠেছিলো ‘গলার কাঁটা’র মতো। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে যখন পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু সংসদ সদস্য এসেছিলেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথ, ডি এল রায়, নজরুল, বাংলা লোকগানের পাশাপাশি বিশেষ করে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়ার আয়োজন করা হয়। ঘটনার ক্রম সবার জানা, বঙ্গভঙ্গ থেকে দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙলাভাষী মানুষের একক রাষ্ট্রীয় ঠিকানা। এই যাত্রার সম্পূর্ণ পথে বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ার ভেতরে হাতে হাত রেখে চলেছে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি; দেশটি তৈরি হওয়ার পেছনের প্রত্যেকটি ঘটনার সঙ্গে সে যুক্ত ছিল। সেটাও ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ও তার কর্মের গ্রহণযোগ্যতার কারণে কেবল নয়, বেশিরভাগ গানটির নির্মাণ ও পঙ্ক্তির ভেতরকার ইশারা ও অর্থগত কারণে। এভাবে পুরো একটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে থেকে গানটি হয়ে উঠেছে বর্তমান বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অংশ।
ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন ভারত উপমহাদেশে যে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটিয়েছিল, সে ক্রিয়ার ভেতর বঙ্গভঙ্গ ঘটনার প্রভাব সুস্পষ্ট। জাতীয়তাবাদী চেতনা অনেক সময় স্বাধীনতা এনে দেয় ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী চেতনার ভেতরে লুকায়িত জাতির স্বাতন্ত্র্য এবং পরিচয় দেওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা, মানুষের অবচেতনে সেটা অসহিষ্ণুতাকে উসকে দেয়। নিজের জাতিকে শ্রেষ্ঠ অথবা অনন্য ভাবার প্রচেষ্টা অন্য জাতি, মত বা গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য এবং বিদ্বেষ সৃষ্টি করে; এই চেতনার সুর চেতনে-অবচেতনে সবসময়ই মানবিকতার মৌলিক ধারণার সঙ্গে অসামঞ্জস্য। দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদিকে শ্রেষ্ঠ ভাবার ভেতর দিয়ে কেবলই নিরেট উগ্রতা জন্মে। সে কারণে বিষয়টি অতি সংবেদনশীল। সচেতনভাবে একে কারবার ও মোকাবেলা না করা গেলে, জাতীয় বোধ ও জাতীয়তাবাদের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক তৈরি না করা গেলে, জাতীয়তাবাদের আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা কিংবা বিন্দুতম সংস্পর্শও মানুষকে মনুষ্যত্বের মৌলিক আদর্শের বিপক্ষে দাঁড় করাবে।
কোনো দেশ বা গোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদ যে উপাদানসমূহের মাধ্যমে প্রকাশ পায় তার মধ্যে জাতীয় সংগীত অন্যতম। যেমন, ফ্রান্সের জাতীয় সঙ্গীতের দ্বিতীয় স্তবকের শুরুতে দেখি স্পষ্ট লেখা : ‘নাগরিকেরা অস্ত্র হাতে নাও!/যুদ্ধদল গঠন করো/মার্চ করো, মার্চ করো’। কিংবা দেখি, রাশিয়ার জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম বাক্যেই রাশিয়াকে সব থেকে পবিত্র ভূমি বলা হচ্ছে। অর্থাৎ, এই কথার আক্ষরিক অর্থের সঙ্গে যে রাশিয়ান অটল বিশ্বাস স্থাপন করে, তার কাছে রাশিয়ার ভূমি বাদে বাকি সকল ভূমি রাশিয়া থেকে নীচ, নিকৃষ্ট। এভাবেই সে বুঝে বা না-বুঝে অন্য জাতিকে ছোটো করে, তার থেকে হীন ভাবে। অন্যকে হীন আর নিজের জাতিকে, দেশকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে গিয়ে সে মনুষ্যত্বের মূলসুরের বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায়। এখানেই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ আমাদের আলাদা কিছু দেখায়। শিল্পে তুলনা চলে না, তবে বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে দেখা যেতেই পারে। পৃথিবীর সব দেশের জাতীয় সংগীতই যে বিপ্লবী ও প্রকট জাতীয়তাবাদের শিক্ষা দেয় তেমন নাও হতে পারে। খুঁজলে হয়ত বেশ কিছু নিখাদ সঙ্গীতের দেখা মিলতেও পারে। স্পেন, কসোভো বা সান মারোনোর জাতীয় সঙ্গীতে তো লিরিক্সই নেই।
‘আমার সোনার বাংলা’ গানের কথাগুলো পড়লে আমরা দেখি, সেখানে বাংলাকে শ্রেষ্ঠ, মহান, পবিত্র, রাজা, রানি এরকম কোনো কথা নেই। কোথাও বাঙলাকে বা বাঙলাভাষীকে অন্যের থেকে বড়ো করে তোলার প্রচেষ্টা নেই। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বহু আগেই রচিত বলে, গানটিতে দেশের নাম স্পষ্টভাবে না থাকা যেন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে উদারতার আলো ছড়ায়। শ্রেষ্ঠত্ব, যুদ্ধ, উগ্রতা, বা হানাহানির বুলি আওড়ানো যে গানে নেই, যুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন হওয়া একটি দেশের তেমন একটি গানকে জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচন করা যেন দেশটির মহানুভবতার পরিচয় বহন করে। এতে ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রের নাম বা ‘বাঙলা দেশ’ পরিভাষাটি সরাসরি নেই, অথচ প্রতি পদের গহিন ইশারা তাকেই নির্দেশ করে। গানটিতে ব্যবহৃত অনুসঙ্গগুলো আর কোনো অঞ্চল নয়, এককভাবে কেবল বাঙলাকেই নির্দেশ করে। প্রতিটি বাঙলাভাষী অনায়াসে সহজ ও গীতিময়ী বাক্যের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা, নিজের নস্টালজিয়ার যোগসূত্র খুঁজে পেতে পারে। একই সঙ্গে, অখণ্ড বাংলার প্রতি বাঙলাভাষীর নিখাদ অবচেতনে যে একাত্মতা আছে, তার প্রতি সুর ফেলা যায়। বাংলাদেশের নিজের সীমানার ভেতরে আবদ্ধ না থেকে, আরও বড়ো অর্থের দিকে, অখণ্ডটার দিকে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়, এর ফলে উদারতা আরও বেশি যেন ধরা পড়ে। এই গানে বিপ্লব নেই, বৈষম্য নেই, কারও সঙ্গে তুলনা করার আকাঙ্ক্ষা নেই, স্বরে নেই ঝনঝনে কোনো সংগ্রামী আবেশ, বরং নরম ব্যাঞ্জনার ভেতর আছে আকুলতা, বিশুদ্ধ আবেগ, মাতৃভূমির জন্য কেবলই নিখাদ ভালোবাসা, দেশপ্রেমের খাঁটি উপাদান—‘ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে’, যেন আমের বোল ফোটার সময়ে মৌমাছির গুঞ্জন আর ফাগুনের হাওয়ার ভেতর জড়িয়ে পড়ার স্মৃতি আমাদের ঘিরে ধরে। পৃথিবীর আর কোথাও ঠিক ফাগুন হাওয়ার ভেতরে এভাবে আমের মুকুল ফোটে? গানটিতে প্রায়ই দেখি ‘ও মা’-এর ব্যবহার। মা পরিভাষাটির অর্থ হলো, যেখান থেকে কিছুর জন্ম ঘটে, যার আশ্রয়ে কোনো কিছু বেড়ে ওঠে, সে অর্থে দেশের মাটিকে ‘ও’ সম্বোধনে এভাবে আদর করে ‘মা’ আর কে ডাকে? সে তো কেবল বাঙলাভাষীরাই ডাকে, আর তার ঠিক প্রতিফলন যেন গানটিতে। কথায় কথায় ‘মরি হায়, হায় রে’, এ মরে যেতে চাওয়া বাস্তবিক কোনো মৃত্যু নয়, বরং আকাঙ্ক্ষা বা উচ্ছ্বাস প্রকাশের চূড়ান্ত রূপ। বাঙলাভাষীরা আবেগের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেলে যেভাবে বলে ঠিক তারই অনুধ্যায় যেন; ভাষায় প্রকাশ করতে না পেরে রূপকের শরীরে প্রকাশ। গানের ভেতরকার ‘অঘ্রান’, ‘ধানে-ভরা আঙিনা’, ‘পাখি-ডাকা ছায়া’, ‘বটের মূলে’র ছায়া কিংবা নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে ঘন বন্ধন বাঙলাভাষী ছাড়া পৃথিবীর আর কোন লোকদের আছে? অনুপম কথাগুলো আর কোন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মেলে?
দেখা যাবে, পৃথিবীর অনেক দেশাত্মবোধক গানেই এমন কিছু মাতৃভূমি বা দেশপ্রেম বিষয়ে গালভরা শব্দ আছে যার কারণে ভাষান্তরের মাধ্যমে গানটিকে যে কোনো দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে। অনেক গানে ব্যবহৃত দেশের নামটি প্রতিস্থাপিত করে ভাষান্তর করলেই অন্য দেশের হতে বাঁধা থাকবে না। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতকে ভাষান্তর করে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়া কোনো দেশের জাতীয় সংগীত করতে গেলে বেশি বেগ পেতে হবে না, কারণ তার ভেতরে ঔপনিবেশিকতা আর যুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতার যে ছবি আঁকা হয়েছে, অনেক দেশের স্বাধীনতার গল্পটা প্রায় কাছাকাছি। কিংবা অস্ট্রিয়ার জাতীয় সংগীত থেকে অস্ট্রিয়া শব্দটি প্রতিস্থাপিত করে ইউরোপের কোনো দেশের জাতীয় সংগীত, বা সৌদি আরবের জাতীয় সংগীত থেকে রাজা আর সৌদি শব্দটা বাদ দিয়ে আরবের কোনো দেশের জাতীয় সংগীত করতে বেগ পেতে হবে না। কারণ গানগুলোতে গালভরা দেশপ্রেম আছে ঠিকই, কিন্তু এমন অনুষঙ্গ নেই যা নির্দিষ্টভাবে কেবল সে অঞ্চলকেই নির্দেশ করে। এই দিক থেকে দেখলেও ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি আলাদা। এই গানে এমনই অপ্রতিম অনুষঙ্গের ব্যবহার করা হয়েছে যা কেবল একটি অঞ্চলকেই নির্দেশ করে। অন্য ভাষায় ভাষান্তর করা হলেও যে আক্ষরিক অর্থ দাঁড়াবে, সেটা কেবল বাঙলাকেই নির্দেশ করবে। এমনকি গানটিতে কেবল বিমূর্ত শব্দের ব্যবহারে কেবল বাঙলার স্তুতি নেই, বরং যে অনুষঙ্গগুলো ব্যবহৃত হয়েছে তাকে সহজে মানসপটে চিত্রিত করা যায়, এমন অনুষঙ্গ ও প্রসঙ্গ এসেছে যা বাঙলাভাষীর প্রাত্যহিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে সহজেই গানটি গাওয়ার সময় স্বাচ্ছন্দ্যে আবেগাপ্লুত অথবা নস্টালজিক হওয়া যায়। যে কারণে, গানটি কার রচনা, কবে রচিত, সেসব অতিক্রম করে, প্রতিটি পঙ্ক্তির ভেতরকার আবেদনের জন্যই বাঙলাভাষীদের ভেতরে সমাদৃত হয়েছে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।