২৫তম পর্ব
“এমন কোনো ক্ষতি হয় না, যা দেখা যায়–
মেফিস্টোফেলিস এই কথা বলেই ফাউস্টের আত্মাটা নিয়ে গিয়েছিল।”
–দেবেশ রায়
গৌহাটি থেকে আমার জলপাইগুড়ি ফেরার ট্রেন রাত ১১ টায়। কিছুক্ষণ সময় আছে হাতে, তাই প্রসূন বর্মনের বাসায় ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। কটন কলেজের (বিশ্ববিদ্যালয়) বাংলার অধ্যাপক প্রসূন আমার বন্ধু, লেখক, প্রাবন্ধিক। তাদের লিটল ম্যাগাজিন ‘নাইন্থ কলাম’ বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। প্রসূনের স্ত্রী বললেন– অনেক রাতের ট্রেন, দাদা আপনি ডিনার করে যাবেন। প্রসূনের ফ্ল্যাট বাড়ির থেকে হাঁটা পথ কামাক্ষা স্টেশান। প্রসূনই পৌঁছে দিয়ে গেল। প্রায় নিস্তব্ধ কামাক্ষা স্টেশান রাতে প্রায় শুনশান। রাতের সেই স্তব্ধতা চিড়ে মাঝেমাঝে মাইকে ঘুমজড়ানো এক ক্লান্ত স্বরের ঘোষণা বেজে উঠছে। আমরা গুটিকয় যাত্রী ট্রেনের প্রতিক্ষায়। প্রতীক্ষা ও পৌঁছানো এই দুই শব্দের সঙ্গে ট্রেন স্টেশনের একটা মায়াবী সম্পর্ক আছে, এই মায়া জড়িয়ে অনেক গল্পও আছে, গল্প তৈরি হয়। যে তিন চারজন স্টেশনে অপেক্ষারত ছিলাম তাদের মধ্যে একজন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেপালি ভাষার অধ্যাপক জীবন ছেত্রী, এও জীবন! প্রসূন পরিচয় করিয়ে দিল। ‘আপনার কম্পার্টমেন্ট কত?’ “বি ২’। ‘ওহ! আমারও তাই, ভালোই হলো কথা বলা যাবে’। কিন্তু অত রাতে ট্রেনে কথা বলা সম্ভব কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। প্রসূন ফিরে গেলে জীবন বাবুর সঙ্গেই কথা বলে সময় কাটছিল। উনি একটা সেমিনারে এসেছিলেন, আজ সময় পেয়ে কামাক্ষা মন্দিরে পুজো দিয়ে এলেন। টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া উত্তরপূর্বের প্রসঙ্গ এলো আমাদের কথাবার্তায়। ডা ছেত্রী বলছিলেন, ‘দাদা, গত দুই তিন শতকের আমাদের এই রাষ্ট্র ও রাজ্যের ভাগাভাগির খেলাটা আমাদের হাতে কোনোদিন ছিল না, হয় কলকাতা না হয় দিল্লি বা ব্রিটেন। যদি আমরা ক্ষমতার নির্ণায়ক হতাম তবে এভাবে আমাদের টুকরো টুকরো করে দেওয়া যেত না। ইতিহাস উলটে দেখুন, এই উত্তরপূর্বাঞ্চল আর আমাদের উত্তরবাংলা তার ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ইতিহাস ঐতিহ্যে একই সূত্রে গাঁথা অথচ আলাদা। তিস্তা তো ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদী, প্রাকজ্যোতিষপুর, পুন্ড্রবর্ধন, রত্নপীঠ, কামাক্ষা, জলপেশ, কামতাপুর– এসব নিয়েই তো আমাদের ইতিহাস। বিহু, ভাওয়াইয়া, পালাগান, তুক্ষা, মুখোশ নৃত্য, মদনমোহন, শংকরদেব, ভানুভক্ত, আব্বাসউদ্দিন– এসব নিয়েই তো আমাদের যৌথ সংস্কৃতি– হিমালয়, জঙ্গল, গন্ডার, হাতি, বাঘ, মানস, জলদাপাড়া, চা বাগান নিয়েই তো আমরা। কিন্তু আজ বর্ডারের ব্যূহ চারদিকে, কোথাও রাজ্যের কোথাও দেশের। একনাগাড়ে কথাগুলো বলতে বলতে থামলেন। আমি তখন ট্রেনের কথা ভাবছিলাম, লেট হচ্ছে খুব। যথারীতি তাই, ট্রেন এলো সময়ের থেকে আধঘণ্টা পরে। গৌহাটি স্টেশান থেকে যারা উঠেছিলেন তারা শুয়ে পড়েছেন। অধিকাংশ আলো নেভানো। আমাকেও উপরের ব্যাংকে উঠে শুয়ে পড়তে হল।
অন্ধকার থাকলেই, রাত বাড়লেই যে ঘুম আসবেই তা সবসময় হয় না। ব্যাংকে উঠে বসলাম। বসা যায় না, মাথা বেঁকে যায়। তাই বাধ্য হয়ে শুয়েই পড়লাম, সাদা চাদরে শরীর মুড়ে। ছুটন্ত ট্রেনের সেই অদ্ভুত একটা ছন্দ নিয়ে দুলুনি ও ধ্বনি আমার কাছে উপভোগ্য মনে হয়। সেই দোলুনির মধ্যেই ডা ছেত্রীর কথাগুলো ভাবছিলাম। এই যে প্রবুব্ধসুন্দর ও আমি, জীবন নরহ ও আমি, প্রসূন ও আমি– মাঝে দীর্ঘ কয়েকশ কিলোমিটার দূরত্ব। প্রবুব্ধ ও আমার বসত বাড়ির মাঝে একটা সরলরেখা টানলে মাঝে চলে আসবে ভিন্ন হয়ে যাওয়া একটা দেশ, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির একটা রাজ্য মেঘালয়, একটা মিশ্র ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর রাজ্য আসাম, আসামকে ছুঁয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য– মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল। জীবন ও আমার মাঝে ভাষা ভিন্নতা, জাতি ভিন্নতা, মাটির ভিন্নতা– অথচ আমাদের মাঝে প্রত্যহ জন্ম নিচ্ছে এক দূরত্বহীন স্পর্শ। আমার বিপরীতে থাকা ডা ছেত্রী, পাহাড়ের মানুষ, হয়ত গত শতাব্দীতেই তার বাবা মায়েরা নেপাল থেকে এসেছেন ভারতে। হয়ত এই কম্পার্টমেন্টেই আদিবাসী কেউ আছেন, চা বাগানের শ্রমিকের সন্তান। দুই পুরুষ আগে যাদের সুদূর উড়িষ্যা বা অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এই ‘দুটি পাতা একটি কুড়ি’র স্বপ্নদেশের প্রলোভনে। এই যে ব্রহ্মপুত্র ছুঁয়ে ফিরছি আমার উত্তরবাংলায়– কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার হয়ে আমার জন্ম শহরে, ইতিহাসের দিকে পেছন ফিরলে এক মহাসম্মিলনের দেখা পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম উদাহরণ, বাংলা গদ্যের আদি উদাহরণ যে চিঠিটি সেটি তো লিখেছিলেন কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণ, ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দে লিখেছিলেন আসামের অহম রাজা স্বর্গনারায়ণকে। নানা রকমের উপঢৌকন সহ যে পত্রটি নরনারায়ণ লিখেছিলেন– “… অখন তোমার আমার সন্তোষ সম্পাদক পত্রপত্রি গতায়াত হইলে উভয়ানুকূল প্রীতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে। তোমার আমার কর্তব্য সে বর্ধিতাক পাই পুষ্পিত ফলিত হইবেক। আমরা সেই উদ্যোগতে আছি তোমরো এ গোট কর্তব্য উচিত হয় না কর তাক আপনে জান। অধিক কি লেখিম …”। ইতিহাস যদি ইতিহাস লেখার ইতিহাস হয়, তবে কোচবিহার রাজদরবারের সাহিত্য ভাষা সাহিত্যের চর্চায় এমন উপেক্ষিত থাকত না। ঔপনিবেশিক শাসন ক্ষমতার কেন্দ্র কলকাতায় যখন ১৯৫৮-তে প্যারিচাঁদ মিত্র তার ‘আলালের ঘরের দুলাল’ লিখছেন প্রায় সমসময়েই কোচবিহারের মহারাজার স্ত্রী বৃন্দেশ্বরী দেবী লিখছেন ‘বেহারোদন্ত’ অর্থাৎ বেহারের ইতিবৃত্ত, ১৮৫৯। এখান থেকেই ১৮৮২-তে প্রকাশিত হয় একটি পূর্ণ উপন্যাস ‘আমিনা’, যখন বঙ্কিম জীবিত, ‘রাজসিংহ’ লিখছেন। অর্থাৎ বাংলার গদ্যসাহিত্যের উষাকাল চলছে। এইসব নানা কথা অন্ধকারের জেগে থাকা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
মাঝে কোথাও ট্রেনটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, নিরাপত্তা রক্ষীরা প্রতিটি কম্পার্টমেন্ট ভালো করে তল্লাশি করে গেল। দীর্ঘদিন থেকেই উত্তর-পূর্বে অশান্তির আগুন জ্বলছে। মাঝে মাঝেই সেই আগুনের আঁচে ঝলসে যায় রেলপথ, সড়ক পথ। ট্রেনে বোমা বিস্ফোরণ, আগ্নিসংযোগ এক নিয়মিত ঘটনা। তল্লাশির সময় আমার আশেপাশের যাত্রীরা ঘুম ভেঙে জেগে উঠলেন। সেই স্টেশান থেকেই দুজন প্যাসেঞ্জার উঠলেন, পোষাক দেখে বোঝা যায় ধর্মে তারা মুসলমান। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখলাম, রাতের অন্ধকার কমে আসছে। তাই হয়ত অনেকেই আর ঘুমের চেষ্টা করলেন না, আমিও দাঁত মুখ ধুয়ে নিচে নেমে আসলাম। নবাগত দুজনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কোথা থেকে উঠলেন?’ ‘কোকরাঝার’। পরে কথায় কথায় জানতে পারলাম তাদের বাসা বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মানকাচরে। আমি বছর খানেক আগে একবার মানকাচরে গিয়েছিলাম। ওদিকে সকাল হয়ে আসছিল, আলিপুরদুয়ার ঢুকল ট্রেন। এখানে অনেকেই নামলেন উঠলেন। নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার জন্য অনেক মানুষ এই ট্রেনটি ধরেন। চাওয়ালা উঠল। অনেকক্ষণ থেকেই একটা কথা জানার ইচ্ছে হচ্ছিল। চা খেতে খেতে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম– ‘আপনারা কি বাংলাভাষী? নাকি অসমীয়ায় কথা বলেন?” স্পষ্টতই তারা এর কোনো সরাসরি উত্তর দিলেন না। আমিও এই নিয়ে আর কথা বাড়ালাম না। এর কারণ মানকাচর ভারতের ভাষা সন্ত্রাসের একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ স্পট। সেখানে প্রায় ১০০% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, কিন্তু আসাম সরকার এই সীমান্তবর্তী জনপদে চূড়ান্ত ভাষা দমন নীতি চালু রেখেছে। যেহেতু এই এলাকা প্রায় বিচ্ছিন্ন ও নগরগুলো থেকে প্রান্তিক অবস্থানে আছে, বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান ধর্মী, তাই ভাষা ও ধর্মের নামে এখানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো সহজ। কথায় কথায় বিদেশি অনুপ্রবেশকারী তকমা দেওয়া যায়। পুরুষানুক্রমে, জন্মাজন্মান্তর এখানে থাকলেও একজন বাংলাভাষী এখানে সহজেই চিহ্নিত হয়ে যান বাংলাদেশি হিসাবে। এখানে প্রতিটি মানুষের ভাষা বাংলা হলেও এ শহরের কোথাও কোনো সাইনবোর্ডে বাংলায় লেখা যবে না, স্কুল কলেজে বাংলায় পত্রপত্রিকা প্রকাশেও নিষেধাজ্ঞা নামিয়ে আনা হয়েছে। এভাবেই একটা জনপদের মানুষের থেকে দ্রুত কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মাতৃভাষার অধিকার। জন্ম নিচ্ছে মাতৃভাষা লুপ্ত ও অবদমিত, সন্ত্রস্ত এক ভাষা উপনিবেশ। এসব ভাবতে ভাবতে নিউ কোচবিহার এসে গেল। রাজনগর, অমিয়ভূষণের। ততক্ষণে ডা জীবন ছেত্রী সামনে চলে এসেছেন। তাকে বলছিলাম মানকাচরের কথা, আসামের ১৯ মে এর ভাষা আন্দোলনের কথা। কথায় কথায় উঠে এলো দার্জিলিং পাহাড়ের লেপচাদের কথা, তাদের ভাষা অবলুপ্তির আশঙ্কার কথা। কিছুক্ষণ পরেই আমার গন্তব্য এসে যাবে, আমি এই অবকাশে আমার ব্যাগ থেকে ‘দ্যোতনা’র ভাষা সংখ্যা বের করলাম। সেখান থেকে তাকে পড়ে শোনালাম দেবেশ রায়ের লেখার শেষাংশ– “… মাতৃভাষা বলে একটাই ভাষার কি তেমন দরকার আছে, তা হলে তার একটাই উত্তর হতে পারে– না, সত্যি তেমন দরকার নেই। মানুষ একটা ফুসফুস নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, একটা কিডনি নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারে, শরীরের ভিতর থেকে অ্যাপেন্ডিক্স, ইউট্রাস, গলব্লাডার কেটে বাদ দিলেও মানুষের বেঁচে থাকার কোনো অসুবিধা হয় না। হাত-পা-জিভ-পাঁজর-গলনালি-চোখ-কান-ধমনী এসব কেটেকুটে এ-সবের বদলি প্লাস্টিক বা স্টেইনলেস স্টিল বসিয়ে মানুষ পুরো দমে বেঁচে থাকতে পারে। আবার এসব গোটা-গোটা রেখেও পাঁচ-আট বছরের দীর্ঘ কোমায় মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। একটা ভাষা যদি তার পরিচয় থেকে বাদ চলে যায় তা হলে কী ক্ষতি হয় মানুষের? একজন বাঙালি যদি সারাটা দিন কোনো বাংলা অক্ষর না লিখে, না দেখে, না শুনে কাটিয়ে দিতে পারেন– কী ক্ষতি তাঁর? এমন কোনো ক্ষতি হয় না, যা দেখা যায়।
“এমন কোনো ক্ষতি হয় না, যা দেখা যায়–
মেফিস্টোফেলিস এই কথা বলেই ফাউস্টের আত্মাটা নিয়ে গিয়েছিল।”