এই তারিখে আমার জন্য এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। আমি আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আবিষ্কার করেছি, অথবা, বরং বলা যায়, একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, যা কখনো আমার সঙ্গে ঘটেছে। আমি এটি আমার জীবনের একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছি। একগুচ্ছ লিখিত কাহিনি একজন ডাক্তারের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছিল, যিনি সেগুলো ব্যবহার করার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন। সেসব কাহিনি বারবার পড়ার পর সেগুলো যে জায়গায় থাকার কথা ছিল, আমি সেখানেই রেখে দেওয়া সহজ উপায় বলে মনে করেছি। আমার অনভিজ্ঞতা আমাকে সেই জায়গা খুঁজে পেতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই জীবন কতটুকু জীবন্ত এবং কতটুকু নিশ্চিতভাবে মৃত, তা আমি বর্ণনা করিনি। আমি মাঝে মধ্যে উদ্বিগ্নভাবে খুঁজে বেড়াই। তখন মনে হয় আমার শরীরের কোনো অংশ কাটা পড়েছে এবং তা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি জানি যে, শরীরের যে অংশের কথা বলেছি, তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল না। তবে পরবর্তীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ ছিল যে, আমি সেই অংশটি সম্পর্কে গভীরভাবে আচ্ছন্ন ছিলাম। আর এখন আমি কী হয়ে গেছি? বেঁচে থাকা কোনো মানুষ নয়, কিন্তু এমন একজন মানুষ যিনি সব কিছু লিখে রেখেছিলেন। আহ! জীবনের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের চিন্তাভাবনাগুলো লিখিত আকারে সংগ্রহ করে একত্রিত করা। যখন অন্য সবাই আমার মতো বিষয়টি পরিস্কারভাবে বুঝবে, তখন তারা সব লিখে রাখবে। তখন জীবন হবে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। অর্ধেক মানবজাতি পাঠের ও অধ্যয়নের জন্য নিজেদের নিয়োজিত রাখবে এবং বাকি অর্ধেক নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখবে। আর মনোযোগের সঙ্গে বিবেচনা করতে যতটুকু সময়ের প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু লাগবে—ভয়ংকর বাস্তব জীবন থেকে বিয়োগ করা সময়। মানবতার এক অংশ যদি বিদ্রোহ করে এবং অন্য অংশের মূল্যবান রচনাদি পড়তে অস্বীকার করে, তাহলে ততই ভালো হয়। প্রতিটি মানুষ নিজেকে অধ্যয়ন করবে। আর প্রতিটি জীবন পরিষ্কার কিংবা ঘোলাটে হয়ে উঠুক না কেন, তা বিকশিত হবে এবং সংশোধন করবে, এমনকি স্ফটিকের মতো জমাট বাঁধবে। অন্তত এটি যেমন অবিচ্ছেদ্য আছে, তেমন থাকবে না, বরং জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সমাধিস্থ হবে। দিনের সঙ্গে সেসব বিবর্ণ হয়ে যাবে এবং পুঞ্জীভূত হবে—অভিন্ন একটির সঙ্গে আরেকটি জমা হয়ে বছর, দশক—এমন একটি জীবন গঠন করবে, যা শুধু জনসংখ্যাতাত্ত্বিক প্রবণতার পরিসংখ্যান সারণিতে একটি সংখ্যা হিসেবে কাজ করে। আমি পুনরায় লেখালেখি শুরু করতে চাই। আমি আমার পুরো সত্তা এবং আমার প্রতিটি ঘটনা লিখে রাখব। বাড়িতে সবাই আমাকে বিরক্তিকর বলে মনে করে। আমি তাদের সবাইকে অবাক করে দেব। আমি মুখ খুলব না, শুধু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে বকবক করব। আমাকে লড়াই করার জন্য তৈরি করা হয়নি। তাই যখন তারা আমাকে দোষারোপ করে যে, আমি কোনো কিছু বুঝতে সক্ষম নই, তখন তা অস্বীকার না করে বরং আমি এখনো নিজের এবং আমার পরিবারের যত্ন নিতে সক্ষম, তা প্রমাণ করতে পারি। তখনই আমি আমার মানসিক শান্তি ফিরে পেতে পারি…
আমি আবিষ্কার করব যে, এখানে যে ব্যক্তিকে নিয়ে লেখা হয়েছে, তিনি বহু বছর আগে আমার নিবন্ধিত ব্যক্তির থেকে অনেকটা আলাদা। জীবন, লেখা না হলেও, তার ছাপ রেখে যায়। আমি মনে করি যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষ আরও ধীরস্থির হয়ে ওঠে। আমি আর সেই বোকা ধরনের অনুশোচনায় ভুগি না, যেগুলো ভবিষ্যতে ভয়ংকর রূপে উপস্থিত হয়ে ভয় দেখাবে। কীভাবে আমাকে আতঙ্কিত করতে পারে? আমি এখন সেই ভবিষ্যৎ নিয়েই বাস করছি। আর এটি অন্য আরেকটি তৈরি না করেই ঘুরছে। সুতরাং এটি সত্যিকারের উপহার নয়, বরং এর অবস্থান সময়ের বাইরে। আমার ব্যাকরণে কোনো চূড়ান্ত ক্রিয়ার কাল নেই। হ্যাঁ, আমি ভেবেছিলাম পুনরুজ্জীবন পদ্ধতি সব কিছু পরিবর্তন করবে। যাহোক, আমি হেঁয়ালির সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সব সময় দ্বিধাগ্রস্ত ও বিভ্রান্ত ছিলাম। আমি চিরতরে আমার মন পরিবর্তন করে যাচ্ছিলাম। আমার এক কান খোলা ছিল, যদি আমার স্ত্রী, আমার মেয়ে কিংবা আমার ছেলে আমাকে থামতে বলার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করা শুরু করে। কিন্তু কেউই তা করেনি। তার কারণ হয়ত তারা সেই আশ্চর্যজনক কর্মকাণ্ডটি প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিল, যা কোনো ক্ষেত্রেই তাদের কোনো কিছুর ক্ষতি হবে না। আর তাই আমি তা সহ্য করলাম এবং কষ্ট করে লুকিয়ে রাখলাম। প্রথমে আমি আমার স্ত্রী এবং আমার মেয়ের সঙ্গে আপস করেছি। তাদের ভয় দেখানোর এবং শাস্তি দেওয়ার আশায় আমার উদ্দেশ্য তুলে ধরেছি। আর তারপর ডাক্তারের সঙ্গে টেলিফোনে, আবারও তাকে ভয় দেখানো এবং শাস্তি দেওয়ার আশায়, নিজের পরিকল্পনার কথা বলেছি। অথচ শেষপর্যন্ত আমি সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অস্ত্রোপচার টেবিলে উপস্থিত হই। পরবর্তীতে এমন এক ঘটনা ঘটেছিল, যা আমাকে আমার শয়নকক্ষে এক মাস আবদ্ধ করে রেখেছে।
এত কিছুর পরেও বার্ধক্য হলো জীবনের শান্তিপূর্ণ স্তর। এত শান্তিপূর্ণ যে, পুরোটা নিবন্ধন করা সহজ নয়। কোথায় ধরতে হবে কিংবা কীভাবে অভিযানের বিষয়টি আসবে, তা বর্ণনা করা শুরু করতে হবে? তার পরের পরিণতি সহজ। সেই অভিযান তারুণ্যের কাছে যে প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিল, তা নিজেই ছিল এক ধরনের যৌবন এবং কঠোর যন্ত্রণা ও দুর্দান্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা সময়। আমি দেখতে পাই কীভাবে আমার জীবন শৈশবে শুরু হয়েছিল, যা অশান্ত কৈশোর পেরিয়ে একদিন যৌবনে পরিণত হয়েছিল—যা এক ধরনের মোহভঙ্গ—এবং তারপর বিয়েতে রূপ নিয়েছিল। তবে জীবনটা মাঝে মধ্যে বিদ্রোহের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়েছিল এবং সেখান থেকে বার্ধক্যে পৌঁছেছি, যার মূল শক্তি ছিল আমাকে ছায়ার মধ্যে ছুড়ে ফেলা এবং অধিবক্তা হিসেবে আমার ভূমিকা বাদ দেওয়া। প্রত্যেকের জন্য, এমনকি আমার নিজের জন্যও, আমার জীবনে অন্যদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছিল—আমার স্ত্রী, আমার মেয়ে, আমার ছেলে এবং আমার নাতি। তারপর আসে অস্ত্রোপচার এবং সবাই আমার দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল। আমি উত্তেজিত হয়ে উঠি এবং জীবনের আগের পর্যায়ে ফিরে যাই—যা আমার নিজের মতো ছিল—আমি বলতে চাই, যে জীবনে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না, তা প্রাকৃতিক জীবন এবং প্রত্যেকেরই আছে—এবং অলৌকিক উত্তেজনা আমাকে সেসব পৃষ্ঠায় নিয়ে গেছে, যা আমি মনে করি আমার কখনই ত্যাগ করা উচিত হয়নি। যদিও আমার আত্ম-তিরস্কার ন্যায়সংগত, তবে তা সেই অন্য বৃদ্ধ লোকটির লজ্জার চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য নয়, যিনি অনুভব করেছিলেন যে তিনি শুকিয়ে গেছেন, কারণ তার জীবনে আর কোনো মহিলার উপস্থিতি ছিল না। আমি লিখছি, কেননা আমাকে অবশ্যই লিখতে হবে। অথচ একসময় আমার হাতে কলম থাকলে আমি হাই তুলতাম। আমি মনে করি অস্ত্রোপচারের ঘটনাটি সম্মানসূচক প্রভাব ফেলেছে।
***
তাই যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। সবাই জানে কীভাবে যুদ্ধ শেষ হয়েছিল এবং সাধারণ বিজয়ের সঙ্গে আমি আমার নিজের বিশেষ বিজয় যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলাম: আমি বৃদ্ধ অলিভিকে দেখাতে চেয়েছি যে, তাকে ছাড়াই আমি আমার সমস্ত কাজকর্ম চালিয়ে কতটা সফল হয়েছি। কিন্তু সেই বৃদ্ধ, যে আমাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয়নি, চলে গিয়েছিল। তার কারণ ছিল যাতে আমার প্রশংসা করতে না হয়। পরে সে ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে পিসা শহরে মারা যায়। তবে যাওয়ার আগে আমাকে জানিয়েছিল যে, সে কখন ফিরে আসবে। এখন থেকে তার কর্তব্য কী হবে, তা উল্লেখ করে আমি তাকে চিঠি লিখেছিলাম। অর্থাৎ সে অফিসের দেখভাল করবে, আর আমি ব্যবসা পরিচালনা করব। আমি অধৈর্য হয়ে তার জন্য অপেক্ষা করেছি; যদি সে সময়মতো সেখানে পৌঁছুতে পারত, তবে সে আমাকে একটি গুরুতর ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হত এবং তা ছিল মিলান শহরে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা সাবানের সমস্ত রেলগাড়ি কেনা। বিশাল হত্যাকাণ্ড ঘটানোর উদ্দেশ্যে গাড়িগুলো থেমে ছিল সীমান্ত খোলার অপেক্ষায়। এই ধরনের চুক্তির সম্ভাবনা আমার যুদ্ধকালীন প্রেরণাকে আন্দোলিত করেছিল। অন্যদিকে অলিভির অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল, যা যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরপরই কার্যকর হতে পারে। আমি শেয়ার বাজারের বিশাল একটা অংশ কিনেছিলাম এবং অন্যদের মতো যুদ্ধকালীন সময়ে বিক্রি করার কোনো তাড়াহুড়া আমার ছিল না। পরিষ্কার করার কী বিশাল প্রয়োজন ছিল? একটা তীব্র দুর্গন্ধ লক্ষ্য করার জন্য কাউকে কেবল ট্রামে উঠতে হয়েছিল—আমার কাছে ছিল এক ধরনের স্বর্গীয় ঘ্রাণ, যা আমাকে সাবানের অভিযান সম্পর্কে আশ্বস্ত করেছিল। অলিভির মৃত্যুর খবর শুনে আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলাম: সে তার পতন থেকে রক্ষা পেয়েছে! পরে অবশ্য আমি খুশি হয়েছি। কেননা ত্রিয়েস্তের কেউই আমার সাবানের প্রতি আগ্রহী ছিল না। তারা কী আর ধোয়ার কাজ করে না? এটি একটি দুঃখজনক দিন হত, যদি অলিভি জানতে পারত যে, যুদ্ধের লাভের বেশিরভাগই শান্তির সময়ে করা চুক্তিতে শেষ হয়ে গেছে। আমি একাই সেই ব্যবসা গুছিয়ে নিয়েছিলাম। তার জন্য আমি নিজেকে মোটেও তিরস্কার করিনি। পৃথিবী এত দ্রুত বদলে গিয়েছিল যে, আমি পিছলে গিয়েছিলাম এবং অজানার উদ্দেশ্যে অচেনা সমুদ্রে পাল তুলে ছিলাম। মিলান শহরে আমি যে সাবান কিনেছিলাম, তাতে অস্ট্রিয়ান আইন অনুযায়ী নির্ধারিত চর্বিযুক্ত সামগ্রী ছিল না। ইতালীয় সৈন্যদের উপস্থিতি সত্ত্বেও অস্ট্র্রিয়ানরা ত্রিয়েস্তে শাসন করে। তাই আমি একজন অস্ট্রিয়ানের কাছে তিন মাসের ধারে সাবান বিক্রি করি, যিনি পরে ভিয়েনার উদ্দেশ্যে রওনা হন, যেখানে সাবান পাঠানোর কথা ছিল। সেখানে, হয় সাবানের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ছিল অথবা আইনি মানদণ্ড পূরণ না করার কারণে, সাবান বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। যে সংস্থা সাবানের দায়িত্ব নিয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত পুরো মূল্য পরিশোধ করেছিল। কিন্তু ক্রোনেন কেবল তখনই এসেছিল, যখন তাদের বিনিময় করতে খুব দেরি হয়ে গিয়েছিল এবং অবশেষে মাত্র কয়েক লিরার সমমূল্য ছিল।
সেটাই ছিল আমার শেষ চুক্তি এবং আমি এখনো মাঝেমধ্যে তা স্মরণ করি। কেউ কখনো তার প্রথম চুক্তির কথা ভুলতে পারে না, যা নিজের সরলতার জন্য নষ্ট হয়ে যায়, অথবা শেষ চুক্তি, যা বিপর্যয় ডেকে আনে, কারণ সে অতিরিক্ত চতুর। আমি আমার চুক্তির বিষয়টি ভুলিনি, কারণ তার সঙ্গে কিছুটা বিদ্বেষ জড়িত ছিল। চালানটি বন্ধ করার ঠিক আগে তরুণ অলিভি যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছিল। চশমাপরা তরুণ লেফটেন্যান্টের বুকে শোভা পাচ্ছিল মেডেল। সে আমার নির্দেশে তার পুরোনো দায়িত্ব পালন করতে রাজি হয়েছিল। আর আমি দ্রুত একজন শাসকের খুব আরামদায়ক ভূমিকায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, যিনি আদৌ কোনো শাসন কাজ পরিচালনা করেন না। অল্প সময়ে আমি আমার নিজের ব্যবসা সম্পর্কে কিছুই জানতে পারিনি। প্রতিদিন নতুন নতুন ইতালীয় আইন এবং ফরমান জারি করা হত, যা একটি দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা হত এবং যার মধ্যে একমাত্র নিশ্চিত জিনিস ছিল আমাদের রাজার মনোনীত সংখ্যা। আমি অলিভিকে সমস্ত নথিপত্র এবং আয়কর প্রতিশোধের দায়িত্ব দিয়েছিলাম (তখনই সমগ্র জাতি অসংখ্য আয়করের চাপে নাস্তানাবুদ হতে শুরু করেছিল)। লোকটি যখন মতের বিরোধী হয়ে ওঠে, তখন আমি অফিস এড়িয়ে যেতে শুরু করি। সারাক্ষণ সে যুদ্ধের সময় তার যোগ্যতা এবং কষ্টের কথা বলতে থাকে। এছাড়া যুদ্ধ বিজয়ে আমার ভূমিকা পালন না করার জন্য আমাকে তিরস্কার করার কোনো সুযোগই সে ছাড়ত না।
সাবান এবং মূল্যহীন ক্রোনেনের কথা বলতে গিয়ে আমি একবার তাকে বলেছিলাম, ‘তবে ভিয়েনিজদের অনুসরণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই কোনো না-কোনো উপায় থাকতে হবে। আমরা তো যুদ্ধে জয়লাভ করেছি, তাই না?’ সে আমার মুখের হাসতে থাকে। আমি সন্তুষ্ট যে, শুধু প্রমাণ করতে যে আমি যুদ্ধে জয়ী হইনি এবং তার জন্য আমাকে ক্ষতিপূরণ দিতে অস্ট্রিয়ানদের বাধ্য করতে সে কখনই কিছু করেনি।
অন্য অবস্থায় সে অত্যন্ত অধ্যবসায়ের সঙ্গে আমার ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিল। সে আমার ছেলে আলফিওর প্রতিও ছিল নিবেদিত। তখন আলফিও জিমনেসিয়াম থেকে বাদ পড়ার পর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মাঝে মধ্যে অফিসে আসত। পরে ছবি আঁকার কাজ শুরু করার পর সে অফিসে আসা বন্ধ করে দেয়—তবে বিষয়টা স্বচ্ছ ছিল যে সামান্য দেখভাল করার বিষয়ে অলিভির কোনো আপত্তি ছিল না।
আমার মেয়ের জামাই ভ্যালেন্তিনোর তত্ত্বাবধানে কাজ করতেও তার সংকোচ ছিল না। এখন সেখানে একজন শ্রমিক! সে সারাদিন ব্যবসার পেছনে ছোটাছুটি করত এবং প্রতি রাতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অলিভির হিসাবের খাতা নেড়েচেড়ে দেখত। আহা! তারপর বেচারা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মারা যায়। তবে তার প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানাই এবং আমি তরুণ অলিভির ওপর একই আস্থা রাখি, যা আমার বাবা ও আমি বয়স্কদের ওপর রাখতাম। অন্যদিকে কেউ হয়ত আরেকটু বাড়িয়ে বলতে পারেন, কারণ বৃদ্ধ অলিভিকে তার জীবনের কোনো সময়েই খুব যত্ন নিয়ে দেখভাল করা হয়নি। আমি মাঝে মধ্যে অফিসে যেতাম, তবে বেশিরভাগ সময় যেতাম অন্য কাউকে তদারকি করার জন্য নয়, বরং নিজের সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য। তখন আমার সন্দেহ হত যে, আমার বাবা হিসাব-নিকাশের কিছুই জানেন না। যাহোক, হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে আমিও কখনই ভালো ছিলাম না। আমি ব্যবসা করতে পারি—অর্থাৎ স্বপ্ন দেখতে পারি এবং চুক্তি সম্পাদন করতে পারি—কিন্তু যখন আমি কাজ শেষ করি, তখন সব কিছু কুয়াশার মতো হয়ে যায়। আমি কেমন করে বিষয়টি নথিভুক্ত করব, তা জানি না।
‘অতি বৃদ্ধের স্বীকারোক্তি’ গল্পটি ইতালো স্বেভোর ইংরেজিতে ‘দ্য কনফেশনস্ অব অ্যা ভেরি ওল্ড ম্যান’ গল্পের অনুবাদ। ইতালীয় ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ফ্রেদেরিকা র্যান্ডল। গল্পটি লেখকের ‘অ্যা ভেরি ওল্ড ম্যান’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত।
লেখক পরিচিতি
ইতালো স্বেভো (আসল নাম অ্যারন ইটোর স্মিটজ) ছিলেন একজন ইতালীয় লেখক এবং ব্যবসায়ী। তিনি ১৮৬১ সালে ত্রিয়েস্তে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ছিলেন ইতালীয় এবং বাবা ছিলেন জার্মান। তিনি তার ভাইদের সঙ্গে জার্মানির একটি বাণিজ্যিক স্কুলে পড়াশুনা করেন এবং জার্মান ভাষা রপ্ত করেন। ইতালীয় ভাষা আসলে তার দ্বিতীয় ভাষা ছিল এবং প্রথম ভাষা ছিল ট্রিয়েস্টাইন উপভাষা, যা বাড়িতে ব্যবহৃত হত। তিনি ১৮৯০-এর দশকে দুটি উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন, উনা ভিটা (অ্যা লাইফ) এবং সেনিলিটা (অ্যাজ অ্যা ম্যান গ্রোজ ওল্ডার), তবে সেগুলো সমালোচকরা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং সাধারণ পাঠক উপেক্ষা করেছিল। ফলে তিনি সাহিত্যচর্চা ছেড়ে শ্বশুরের রঙের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯০৭ সালে স্বেভো ইংরেজি শেখার জন্য বার্লিটজ স্কুল অব ল্যাঙ্গুয়েজে ভর্তি হন। সেখানে তার শিক্ষক ছিলেন পঁচিশ বছর বয়সী আইরিশ নাগরিক জেমস জয়েস (পরবর্তীতে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, কবি এবং সাহিত্য সমালোচক), যিনি তখন ত্রিয়েস্তে শহরে নির্বাসিত ছিলেন। জয়েস স্বেভোর উপন্যাস দুটি পড়েন এবং ভূঁয়সী প্রশংসা করেন। স্বেভো ১৯২৫ সালে লা কনকোসিয়েনজা ডি জেনো (কনফেশনস অব জেনো) প্রকাশ করেন। প্রকাশের পরপরই উপন্যাসটি সমালোচকরা দারুণ প্রশংসা করেন এবং সাহিত্য রচনায় তার প্রথম বড় সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি উৎসাহিত হয়ে সাহিত্য জগতে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তার বেশ কয়েকটি গল্প এবং একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। তিনি ১৯২৮ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হন।