ইসলামের ইতিহাসে যেসব মনীষী তাদের জ্ঞানের গভীরতা, চিন্তার প্রখরতা ও সংগ্রামের তেজস্বিতা দিয়ে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তাদের মধ্যে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে মুফাক্কির (চিন্তাবিদ), মুহাদ্দিস (হাদিস বিশারদ), ফকিহ (ফিকহ বিশেষজ্ঞ) ও মুজাদ্দিদ (সংস্কারক)। তার জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা, দাওয়াহ ও ইসলামের মৌলিক চেতনাকে পুনর্জীবিত করার এক দুর্দান্ত দৃষ্টান্ত। ইমাম আহমদ ইবনে আবদুল হালিম ইবনে আবদুস সালাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দে (৬৬১ হিজরি) সিরিয়ার হারান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল সুপ্রসিদ্ধ হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী এবং বহু প্রজন্ম ধরে ইসলামী শিক্ষা ও ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান। তার পিতা শায়খ আবদুল হালিমও ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম ও শিক্ষক। মঙ্গোলদের তাণ্ডবের কারণে পরিবারটি দামেস্কে হিজরত করে এবং সেখানেই ইবনে তাইমিয়ার শৈশব ও কৈশোর কাটে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন। অল্প বয়সেই কোরআন হিফজ করেন এবং ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গভীর মনোযোগী হন। তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকহ, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস ও দর্শনের ওপর বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। তার শিক্ষক ছিলেন সে যুগের খ্যাতনামা আলেমরা; যেমন—শায়খ শামসুদ্দিন আল-মাকদিসি, শায়খ কুতবুদ্দিন আন-নাসাফি ও শায়খ মুহিউদ্দিন আল-হাররানি। তার স্বভাবগত অধ্যবসায়, মেধা ও প্রচেষ্টা তাকে সমকালীন আলেমদের মধ্যে দ্রুত স্বতন্ত্র করে তোলে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া ইসলামের শুদ্ধতম ব্যাখ্যা উপস্থাপনের জন্য প্রসিদ্ধ। তিনি কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণকে প্রধান করে তুলতে চান এবং মতবাদগত চরমপন্থা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া শুধু একজন চিন্তাবিদই নন, বরং একজন সক্রিয় সমাজসংস্কারক ও জিহাদের প্রবক্তাও। তার সময়ে মঙ্গোল বাহিনী মুসলিম উম্মাহর জন্য এক ভয়ংকর বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফতোয়া প্রদান করেন এবং মুসলিম শাসকদের জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। দামেস্ক ও মিশরের শাসকদের তিনি ইসলামের শত্রুদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে (৭০২ হিজরি) শাখাব ও মারজ আস-সুফফার যুদ্ধে স্বয়ং যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দেন এবং মুসলিম বাহিনীকে উজ্জীবিত করেন। তার বক্তব্য ও লেখনী সেই সময়ের মুসলিমদের মধ্যে দৃঢ় মনোবল সঞ্চার করে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়ার নির্ভীক সত্যবাদিতা ও প্রচলিত কুসংস্কারের বিরোধিতার কারণে তিনি বারবার শাসকগোষ্ঠীর বিরাগভাজন হন। বিশেষত যখন আল্লাহর গুণাবলি ও আরশ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন, তখন কিছু আলেম তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে এবং তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৩০৬, ১৩১৩ ও ১৩২৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিভিন্ন সময়ে বন্দি হন। শেষবার কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় তাকে লেখালেখি থেকেও বিরত রাখা হয়। ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দ (৭২৮ হিজরি) দামেস্কের কারাগারে ইমাম ইবনে তাইমিয়া ইন্তেকাল করেন। তার জানাজায় লাখো মানুষ অংশগ্রহণ করে, যা তার প্রতি জনগণের ভালোবাসার প্রতিফলন ছিল। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার রচনাসমূহ আজও ইসলামী চিন্তায় গভীর প্রভাব বিস্তার করে চলছে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো—‘মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া’ (তার ফতোয়া ও চিন্তাধারার সংকলন), ‘কিতাবুল ইমান’ (ইমান ও আকিদার বিশ্লেষণ), ‘মিনহাজুস সুন্নাহ’ (শিয়া মতবাদের খণ্ডন), ‘দার তাআরুদিল আকল ওয়ান নকল’ (যুক্তিবাদী দর্শনের অপব্যাখ্যার প্রতিক্রিয়া), ‘আস-সিয়াসাহ আশ-শারইয়াহ’ (ইসলামী শাসনব্যবস্থা ও নীতিনির্দেশ) প্রভৃতি। তার চিন্তাধারা পরবর্তী বহু ইসলামী সংস্কারবাদীকে অনুপ্রাণিত করেছে, বিশেষত মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওহহাব, সালাফি আন্দোলন ও আধুনিক ইসলামী আন্দোলন তার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।