৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের মধ্যে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। কিন্তু এই লড়াইয়ে জিততে দুজনেরই প্রয়োজন ভারতীয় ভোটারদের সমর্থন। তাই উভয়ের নজরেই এখন রয়েছেন প্রবাসী ভারতীয়রা।
বেশ কয়েকবছর ধরে মার্কিন নির্বাচনে প্রবাসী ভারতীয়রা খুব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। সেখানে বাস করছেন প্রায় ৫২ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, যা আমেরিকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১.৫ শতাংশ। তাদের মধ্যে ২৬ লাখেরও বেশি এবার ভোট দানের যোগ্য। প্রবাসী ভারতীয়রা এখন আমেরিকার সবচেয়ে সফল গোষ্ঠী যারা এক শতাব্দী আগেও ছিলেন অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক সম্প্রদায়। আমেরিকায় মেক্সিকানদের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্প্রদায় তারা। পরিসংখ্যান বলছে, প্রবাসী ভারতীয়দের গড় পরিবারিক আয় প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার মার্কিন ডলার।
বর্তমানে ভারতীয় বংশোদ্ভুতরা মার্কিন কর্পোরেট সংস্থা নোভারটিস, স্টারবাকস, ভার্টেক্সের সিইও পদে যেমন আছেন, তেমনই আইটি সেক্টরের মাইক্রোসফট, অ্যাডোব, গুগল, আইবিএম-এর সিইও পদে রয়েছেন। এছাড়া বিজ্ঞানে নোবেলজয়ী হরগোবিন্দ খোরানা ও সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর, অর্থনীতিতে অমর্ত্য সেন ও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যে স্বীকৃতি ঝুম্পা লাহিড়ী ও বিক্রম শেঠ,সাংবাদিকতায় আলি ভেলশি ও ফরিদ জাকারিয়া,সংগীতে নোরা জোন্স ও জুবিন মেহতা, এবং কমেডি শোআপে মিন্ডি কালিং, আজিজ আনসারি, হাসান মিনহাজ যথেষ্ট সমাদৃত মার্কিন সমাজে।
আমেরিকায় এই মুহূর্তে সমস্ত মোটেলের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং সমস্ত ট্রাকের ২০ শতাংশের মালিক ভারতীয়রা। এই মুহূর্তে ভারতীয়দের দখলে রয়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ সিনিয়র সরকারি পদ।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা। এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী খোদ কমলা হ্যারিসের মা শ্যামলা গোপালন একজন ভারতীয়। মার্কিন কংগ্রেসের পাঁচ সদস্য অমি বেরা, প্রমীলা জয়পাল, রো খান্না, রাজা কৃষ্ণমূর্তি ও শ্রী থানাদারর রয়েছে ভারতীয় রক্ত। ডেমোক্র্যাটদের ভোটব্যাংক বলে পরিচিত ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয়, নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্কের মতো রাজ্যগুলিতে ৫০ শতাংশেরও বেশি রয়েছেন ভারতীয় আমেরিকান ভোটার। আবার জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা ও পেনসিলভিনিয়ার মতো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সুইং স্টেটগুলিতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভারতীয় আমেরিকান ভোটার বাস করেন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত নির্বাচনে আমেরিকায় বসবাসরত অন্যান্য সমস্ত জাতিগুলোর তুলনায় ভারতীয় সম্প্রদায়ের সর্বাধিক ৭১ শতাংশ ভোট পড়েছে। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, ৯৬ শতাংশ ভারতীয়-আমেরিকান ভোটার এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
২০২৪ সালের এই নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রয়েছে ভারতীয়-আমেরিকানদের। তারা রাজ্যগুলোর নির্বাচনে বিজয়ের ব্যবধানকে প্রভাবিত করতে পারে। তাদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৫ শতাংশ) ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ঝুঁকেছেন। অন্যদিকে, ২৬ শতাংশ ভারতীয়-আমেরিকান রিপাবলিকান সমর্থক। বলা হচ্ছে, ভারতীয়রদের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থক কম থাকার শীর্ষ ৫টি কারণ হল- গর্ভপাত ইস্যু, সংখ্যালঘুদের অসহিষ্ণুতার উপলব্ধি, খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারের প্রতি আনুগত্য, অর্থনৈতিক নীতি ও বন্দুক বহন আইন।
তবে দু’দলই ভারতীয় আমেরিকানদের ভোট পেতে সচেষ্ট। আর সেকারণেই, ২০২৩ সালে নিউ ইয়র্ক গভর্নর ক্যাথি হচুল শহরের সমস্ত স্কুলের জন্য দিপাবলীকে সরকারি ছুটি হিসাবে ঘোষণা করার জন্য একটি আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন। স্টেট সেনেটর জেরেমি কুনি সম্প্রতি একটি নতুন বিল এনেছেন, যাতে রাজ্য জুড়ে সব স্কুলের জন্য দীপাবলিকে একটি সরকারি ছুটি হিসাবে ঘোষণা করা যায়। ডেমোক্র্যাট গভর্নর জশ শাপিরো আনুষ্ঠানিকভাবে এই বছর পেনসিলভেনিয়ায় দীপাবলীকে একটি সরকারি ছুটি হিসাবে ঘোষণা করার জন্য আইনে স্বাক্ষর করেছেন। ট্রাম্প একটি মার্কিন কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্বয়ংক্রিয়’ গ্রিন কার্ডের প্রস্তাব করেছিলেন। এটি ভারতীয় জনসংখ্যাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সম্প্রতি তিনি ভারত, প্রধানমন্ত্রী মোদি ও হিন্দুদের প্রশংসায় অত্যন্ত সোচ্চার হয়েছেন। তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি হিন্দু গণহত্যার স্মৃতিসৌধ নির্মাণের প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন।
তবে, শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, তা ভবিষ্যদ্বাণী করা খুব কঠিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে যেই জিতুন না কেন, সামগ্রিকভাবে আমেরিকান রাজনৈতিক ভূখণ্ডে ভারতীয় ভোটারদের প্রভাব অবশ্যই বাড়ছে এবং আগামী বছরগুলিতেও ভারতীয় ভোটারদের উপেক্ষা করা উভয়পক্ষের জন্যই কঠিন হবে।