মানিকগঞ্জে যে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে তার মধ্যে বালিয়াটি প্রাসাদ অন্যতম। প্রাসাদটি ঢাকা থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে এবং মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্ব দিকে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাসাদটি স্থানীয়ভাবে বালিয়াটি জমিদারবাড়ি নামেই পরিচিত।
ঈদুল ফিতরের ছুটির শেষের দিকেও এ জমিদার বাড়ি দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই আছে। বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে সাধারণ ভ্রমণ পিপাসুরা ৩০ টাকায় টিকিট কেটে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন পরিবারের সদস্যদের সাথে।
জানা গেছে, বালিয়াটির জমিদাররা উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক বছর বহুকীর্তি রেখে গেছেন, যা জেলার পুরাকীর্তিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। পুরাকীর্তির ইতিহাসে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি এক অনন্য সৃষ্টি। খ্রিস্টীয় উনিশ শতকের দিকে এই বাড়ি নির্মিত হয়। একটি নিম্নবিত্ত সাহা পরিবার থেকেই বালিয়াটি জমিদার বংশের উদ্ভব।
বালিয়াটির জমিদারদের পূর্বপুরুষ গোবিন্দ রায় সাহা ছিলেন একজন ধনাঢ্য লবণ ব্যবসায়ী। এই বাড়ির উত্তর-পশ্চিম অংশে লবণের একটা বড় গোলাবাড়ি ছিল। এই কারণে এই বাড়ির নাম রাখা হয়েছিল গোলাবাড়ি। সেকালে গোলাবাড়ির চত্ত্বরে বারুনির মেলা বসত এবং এর পশ্চিম দিকে তাল পুকুরের ধারে আয়োজন করা হতো রথ উৎসব। বসত রথের মেলা। তবে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে বর্তমানে এই স্থানে রথের মেলা না হয়ে হয় বালিয়াটি গ্রামের পুরান বাজারের কালী মন্দিরের পাশে।
গোবিন্দ রায়ের পরবর্তী বংশধর দাধী রাম, পণ্ডিত রাম, আনন্দ রাম ও গোলাপ রাম। এই পরিবারে স্মরণীয় অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন নিত্যানন্দ রায় চৌধুরী, বৃন্দাবন চন্দ্র, জগন্নাথ রায়, কানাই লাল, কিশোরি লাল, যশোর্ধ লাল, হীরা লাল রায় চৌধুরী, ঈশ্বর চন্দ্র রায় চৌধুরী, হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী প্রমুখ। ঢাকার জগন্নাথ মহাবিদ্যালয় (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদেরই বংশধর বাবু কিশোরীলাল রায়। আনুমানিক ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে বালিয়াটি জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন হয়।
১৩০০ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ এই বাড়ির জমিদাররা গৃহপ্রবেশ করেন বলে জানা যায়। এই জমিদার বাড়ি ৫.৮৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে একটি বড় পুকুর। বাড়িটির সম্মুখভাগে চারটি সুবিন্যস্ত সিংহদ্বার সমৃদ্ধ চারটি বিশাল প্রাসাদ পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত এমন সুদৃশ্যভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানে সাতটি প্রাসাদতুল্য ইমারতে মোট ২০০টি কক্ষ আছে।
বালিয়াটি প্রাসাদের প্রতিটি প্রবেশ পথের চূড়ায় রয়েছে পাথরের তৈরি চারটি সিংহমূর্তি। যাকে বলে সিংহ দরজা। ছোট ছোট ফুল সমৃদ্ধ এমন প্রাচীন সৌন্দর্য যেন দৃষ্টি নন্দিত।
স্থানীয়দের মতে, এর মূল প্রবেশদ্বার কাঠের তৈরি ছিল। এখানে পূর্ববাড়ি, পশ্চিমবাড়ি, উত্তরবাড়ি, মধ্যবাড়ি এবং গোলাবাড়ি নামে বড় আকারের পাঁচটি ভবন। জমিদারবাড়ির এই বিভিন্ন অংশ বালিয়াটি জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকারীরাই তৈরি করেন বলে জানা যায়। এই রাজবাড়ির প্রথম সারিতে চারটি প্রাসাদ রয়েছে। এগুলোর নির্মাণশৈলী মোটামুটি একই রকম। চার-চারটা জমিদার বাড়ি, প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এক একটি প্রাসাদ এতই কারুকাজে পূর্ণ যে প্রতি মুহূর্তেই বিস্মিত হয় দর্শনার্থীরা। আট ইঞ্চি করে সিড়ির উত্থান আর বিশাল বিশাল স্তম্ভগুলো চুন-সুরকি আর ইট দিয়ে তৈরি। প্রতিটা স্তম্ভের স্তম্ভমূল ছয় ফুটের অধিক।
গ্রিক স্থাপত্যের মতোই কারুকাজমণ্ডিত স্তম্ভের ওপরের দিকটা প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে। ফ্লোরাল টপসহ কোরেন্থিয়ান ধাঁচের পিলার আছে চার প্রাসাদেই। এর মাঝখানের দুটি প্রাসাদ দুই তলা এবং দুই পার্শ্বের দুটো প্রাসাদ তিন তলা। এর মধ্যে ১টি প্রাসাদে আগে কলেজ ছিল, বর্তমানে তা পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে বলে জানা গেছে।
২ নম্বর প্রাসাদের ভেতরেই বর্তমান জাদুঘর। এর দ্বিতীয় তলায় একটি রংমহল রয়েছে। এখানে জমিদারদের ব্যবহৃত নিদর্শনাদি দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে। নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে জমিদারদের ব্যবহৃত অসংখ্য সিন্দুক, ছোট-বড় আয়না, ঝাড়বাতি, লণ্ঠন, শ্বেত পাথরের ষাঁড়, শ্বেত পাথরের টেবিল, পালঙ্ক, আলনা, কাঠ এবং বেতের চেয়ারসহ আরো অনেক নিদর্শন। মজলিস কক্ষে মূল্যবান ঝাড়বাতি রয়েছে। মজলিস কক্ষটির দেয়ালে হাতে আঁকা ছবি আছে। এর অন্দর মহলে রয়েছে তিনটি অট্টালিকা। এখানে ছিল অতিথিদের থাকার জায়গা, রন্ধনশালা, সহিস আর পরিচারকদের থাকার ঘর।বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রাসাদটির রক্ষণাবেক্ষণ করছে।
এখানে দেশি দর্শনার্থীরা ২০ টাকা টিকিট দিয়ে ঢুকতে পারবেন। এছাড়া, সার্কভুক্ত দর্শনার্থীকে ১০০ টাকা এবং বিদেশি দর্শনার্থীকে ২০০ টাকা টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। রবিবার পূর্ণদিবস ও সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে এই প্রাসাদ।
টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার তোফাজ্জল হোসেন। চাকরি করেন একটি বেসরকারি কোম্পানিতে। সারা বছর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথাও বেড়ানোর সুযোগ পান না। তাই ঈদের ছুটিতে পরিবারের তিন সদস্য নিয়ে বেড়াতে এসেছেন বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে। স্বামী ও স্ত্রী টিকিট ৩০ টাকা করে ৬০ টাকা, ছেলে বয়স পাঁচ বছর হওয়ায় লেগেছে ২০ টাকার টিকেট।
তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “ইতিহাস ঐতিহ্যঘেরা এ জমিদার বাড়িতে ২০২৫ সালে এসেও মাত্র ৮০ টাকায় পরিবার নিয়ে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারলাম। এখানে না এসে প্রাইভেট কোনো বিনোদন কেন্দ্রে গেলে কয়েক হাজার টাকা টিকিট কাটতে হত। সেই হিসেবে আমাদের সবার পছন্দ এ জমিদার বাড়িটি।”
মানিকগঞ্জের সেওতা থেকে এসেছেন রুদ্র নামে এক কিশোর। তিনি বলেন, “আমাদের ঈদ মানেই বন্ধুদের নিয়ে বাইক নিয়ে বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে বেড়াতে আসা। মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হওয়াতে এখানে বেড়াতে না আসলে ভাল লাগে না।”
সুমাইয়া নামের এক গৃহিণী বলেন, “এক টিকিটেই সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বেড়ানো যায় এ জমিদার বাড়িতে। তাছাড়া জমিদার বাড়িতেই ভাল খাবারের ব্যবস্থা, নাস্তার দোকান, খেলার মাঠ, মসজিদ রয়েছে।”
সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে। সাটুরিয়ায় বাড়তি পর্যটকদের কথা চিন্তা করে আমাদের প্রশাসনের বাড়তি নজরদারি রয়েছে।”