চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার আল্লাই কাগজিপাড়া গ্রামে ছিল আমাদের বাড়ি। বোমা পড়ার ভয়ে স্কুল বন্ধ ছিল আমাদের। লোকজন বলাবলি করছিল, আর লেখাপড়া হবে না। আমি তাই বাড়ির পাশে সাবান, চুড়ি, ফিতা এসব নিয়ে বসতাম। যদি বিক্রি হয়, কিছু টাকা আসবে, সংসারের কাজে লাগবে। রোজার মাসে একদিন সদর থেকে ১৯৩৭ সাবানসহ কিছু জিনিস নিয়ে কাগজিপাড়ায় যাচ্ছি। পথে সেনারা গতি রোধ করল। তল্লাশি করে বের হলো গোল বল সাবান। এই সাবানটি হয়তো চিনতে পারেনি সেনারা। তাই পথে আরেকজনকে ডেকে নিশ্চিত হলো, এটা সাবান। ১৯৭১ সালে পবিত্র রমজান মাসের একটি দিনের ঘটনা এটি। এমন ভয় ধরানো অস্বস্তিকর পরিবেশে সেবার ঈদ উৎসবের লেশমাত্র ছিল না।
১৯৬১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা তিন ভাই ছিলাম মায়ের সঙ্গে। বড় ভাই জাহেদুল হক বন্দরে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে বেশির ভাগ সময় চট্টগ্রামে থাকতেন তিনি। বাড়িতে তখন আমি, মেজ ভাই আমিনুল হক আর আমার মা নুর খাতুন ছিলাম। ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল আমার মেজ ভাই পাকিস্তানিদের বিমান হামলায় মারা যান। মাত্র ২৫ বছর বয়স ছিল তাঁর। এ ঘটনার পর আমাদের পরিবারে স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে যায়। আম্মা আমাকে আর ভাইদের নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতেন।
একাত্তরের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে রোজা শুরু হয়। আমি তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। পড়ি রাহাত আলী উচ্চবিদ্যালয়ে। রোজার মাসে ঘরে বসেই দিন কাটছিল আমার। বড় ভাই বন্দরের কর্মকর্তা, সপ্তাহে দুই–তিনবার বাড়িতে আসতেন। আসার সময় বাজার নিয়ে আসতেন। রোজায় তাঁর আনা ছোলা, চিড়া খেতাম আমরা। কখনো কখনো কলা পেতাম। আর সাহ্রিতে দুধভাত।