ইংরেজি নতুন বছর আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বে যেখানে আনন্দ আর উদযাপনের রঙিন আয়োজন দেখা যায়, সেখানে তাইওয়ানে কিছু মানুষ নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছেন এক ভিন্ন উপায়ে—কান্নার মাধ্যমে।
তাইপেই শহরের দা’আন ফরেস্ট পার্কে এই কান্নার উৎসবের আয়োজন করেছিলেন ২২ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হ্যারি লি। ২০২৩ সালে মজার ছলে ফেসবুকে করা একটি পোস্ট থেকে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সূচনা হয়। পোস্টে তিনি আহ্বান জানান মানুষকে পার্কে এসে ৩০ মিনিট ধরে কাঁদতে, যা জনপ্রিয় তাইওয়ানিজ চলচ্চিত্র ‘ভিভ ল’আমোর’- এর একটি দৃশ্য থেকে অনুপ্রাণিত।
১৯৯৪ সালে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত এই চলচ্চিত্রটি তাইপেই শহরের দ্রুত আধুনিকায়ন এবং নগরজীবনের একাকীত্ব ও অবসাদকে চিত্রিত করে। চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নারী চরিত্রটি পার্কের বেঞ্চে বসে দীর্ঘক্ষণ কাঁদার পর সিগারেট জ্বালিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
হ্যারি লি’র পোস্টটি মজার জন্য করা হলেও তা দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। ২০২৩ সালের নববর্ষের রাতে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ এতে যোগদানের আগ্রহ দেখান। শত শত মানুষ পার্কে জড়ো হয়ে কাঁন্না, হাসি, গান গাওয়া, নাচ ও গল্প বলার মাধ্যমে উৎসব উদযাপন করেন।
লি বলেন, আমি কখনও ভাবিনি মানুষ সত্যিই আসবে বা এটি এতোটা জনপ্রিয় হবে।
২০২৪ সালের এই কান্নার উৎসবে ইতোমধ্যে ৩৩ হাজার মানুষ যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এবার তাইওয়ান ফিল্ম অ্যান্ড অডিওভিজ্যুয়াল ইনস্টিটিউট এই আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তারা পার্কে ‘ভিভ ল’আমোর’ চলচ্চিত্রের মুক্তির ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি আউটডোর প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। চলচ্চিত্রের মূল অভিনয়শিল্পীরা এতে অংশ নেবেন।
২০২৩ সালে অংশগ্রহণকারীরা এই আয়োজনকে সংবেদনশীল ও আবেগঘন বলে বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ সেখানে নিজের কষ্টের কথা ভাগাভাগি করে কেঁদেছেন, আবার অনেকে নিজেদের আবেগমুক্ত করেছেন।
অ্যাস্টার চ্যাং বলেন, ‘আমি সত্যিই কেঁদেছি! একটি পুরো টিস্যু প্যাকেট শেষ হয়ে গিয়েছিল’। আরেক অংশগ্রহণকারী চেন চু-ইয়ুয়ান বলেন, ‘যখন আপনি এখানে কাঁদবেন, তখন মানুষ আপনাকে সান্ত্বনা দেবে, আঙুল তুলে দেখাবে না।’
এই কান্নার উৎসবটি দেখিয়েছে যে, সবাই একই ভাবে আনন্দ উদযাপন করে না। যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবন দেখে ঈর্ষান্বিত বা একাকী বোধ করেন, তাদের জন্য এটি ছিল এক বিরল ও মুক্তির মতো অভিজ্ঞতা।
তাইপেইয়ের ন্যাশনাল চেংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাং তিং-ইউ বলেন, এই আয়োজনটি প্রমাণ করে যে জীবনের একক কোনও সংজ্ঞা নেই এবং আবেগ প্রকাশ করার অনেক রকম পথ আছে।
তাইওয়ানে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের প্রতি চারজনের একজনের মধ্যে বিষণ্নতা বা উদ্বেগের লক্ষণ দেখা গেছে। এই সমস্যার সমাধানে সরকার বিনামূল্যে কাউন্সেলিং প্রোগ্রাম চালু করেছে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেন, একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারকে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।
অধ্যাপক চ্যাং শু-সেন বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষকে সহায়তা করার জন্য বাস্তবসম্মত উপায়ও প্রয়োজন।
লি বলেন, এই আয়োজন যারা নিজেদের মনের বোঝা কমাতে এসেছিলেন, তাদের জন্য কাজে এসেছে। তবে আমি আশা করি, পরের বছর তাদের আর কাঁদতে হবে না এবং তারা একটি সুখী নববর্ষ উদযাপন করতে পারবেন।
সূত্র: সিএনএন