জনমুখী হওয়ার পরিবর্তে জনপ্রশাসন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কারণ এখনো ব্রিটিশদের বানানো নিয়ম চালু রয়েছে। এজন্য এ খাতের সংস্কার করতে হবে। এতে স্থানীয় সরকারকে প্রাধান্য দেওয়া, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে জবাবদিহির আওতায় আনাসহ জনমুখী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ, জনপ্রশাসন প্রসঙ্গ’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন আলোচকরা।
অনুষ্ঠানে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর পদগুলো ধীরে ধীরে অ্যাডমিন ক্যাডারে চলে গেছে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনতা না দিলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ দেশে ব্রিটিশরা জনপ্রশাসন তৈরি করেছে। সেখানে দক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের কাজ ছিল ব্রিটিশদের রাজত্ব এখানে স্থায়ী করা। তাদের উত্তরাধিকার এখনো আমরা দেখতে পাই। আমাদের দেশে যে উদ্দেশ্য নিয়ে জনপ্রশাসন তৈরি করা হয়েছে তা এখনো পূরণ হয়নি।
মুনিরা খান বলেন, দুর্নীতি কমাতে হবে। আগে এনআইডি পেতে যে টাকা দিতে হতো, এখন তার চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়। দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে এগোনো উচিত। সমাজ, সরকার ও জীবনের সর্বস্তর থেকে দুর্নীতি বাদ দিতে হবে। এখানে নজর দিতে হবে।
ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, আমাদের প্রশাসনে এখনো দালালি স্বভাব আছে। আমাদের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা থাকতে হবে, এটি কেবল প্রশাসনের মধ্যেই থাকবে না। কেন্দ্রীভূতকরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা যাবে না। সংস্কার করে তারপর নির্বাচনের দিকে যেতে হবে।
তদবির সংস্কৃতিকে জনপ্রশাসনের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এই তদবিরের বাইরে নয়। গত চার মাসে যেসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার অনেক নিয়োগ প্রশ্নবোধক, ত্রুটি আছে।
মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এই সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো জুলাইয়ে শহীদ ও আহতদের আর্থিক সাহায্য দেওয়া।
মীর নাসির হোসেন বলেন, ২০০৬ থেকে প্রশাসনের রাজনীতিকরণ শুরু হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সরকারকে ব্যবসা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটা নিয়ে পলিসি করতে হবে। প্রতিটি প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। প্রশাসনকে জনবান্ধব করতে হবে।
ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, পরিবর্তন দেশের ও মানুষের জন্য দরকার। ব্রিটিশদের তৈরি করা আইনকানুন এখনো চলছে। ভিয়েতনাম ফ্রান্সের সব আইন বাতিল করেছিল; কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি। আমাদের নৈতিকতা ঠিক করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তৈরিকৃত আইন নির্বাচিত সরকার অনুমোদন দেবে। যদি নির্বাচিত সরকার অনুমোদন না দেয় তাহলে এত সংস্কার করে কোনো লাভ নেই। মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আমাদের প্রশাসন এত বড় কেন? জনপ্রশাসনকে ছোট করতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। ব্রিটিশ নিয়ম এখনো চলছে। এগুলো বাদ দিতে হবে।
অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমলাদের এখনো মনমানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। বিসিএসের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার সংস্কৃতি বাদ দিতে হবে। পরীক্ষার নামে যা হয় তা বদলানো দরকার। যারা দুর্নীতিবাজ তাদের শুদ্ধাচার পদে রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক কে হবেন, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অফিসারস ক্লাবগুলো হয়ে গেছে আমলাদের পদোন্নতির প্রতিষ্ঠান। আমরা এখন জটিল সময়ে আছি। জুলাইয়ের পর থেকে অনেক আমলা পালাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা পালাচ্ছে ঠিক আছে; কিন্তু আমলাদের তো পালানোর কথা নয়। আমলারা সম্পদের পাহাড় তৈরি করেছে। আমি চাই এই সরকার সফল হোক; কিন্তু আমি আশঙ্কায় আছি আবার ১/১১ হয় কি না। সংস্কারের নামে সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না।
সভাপতিত্ব করেন সিজিএসের চেয়ার মুনিরা খান। সঞ্চালনা করেন নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।