Homeঅর্থনীতিসরকারের নীতিনির্ধারকদের বারবার আশাবাদ, তবু অধরা মূল্যস্ফীতির লাগাম

সরকারের নীতিনির্ধারকদের বারবার আশাবাদ, তবু অধরা মূল্যস্ফীতির লাগাম


বাজারে এখনও জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক। বেশিরভাগ মানুষ তার সীমিত আয় দিয়ে এই অস্বাভাবিক দামের সঙ্গে কুলাতে পারছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকছে না, বরং ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি কঠোর করার পাশাপাশি আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৩২ শতাংশ। যদিও আগের মাস ডিসেম্বরে ছিল ৯.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি খানিকটা বেড়েছে। অবশ্য অর্থ উপদেষ্টাসহ সরকারের নীতিনির্ধারকরা বারবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আশাবাদ প্রকাশ করলেও বাস্তবে এর লাগাম টানতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

এই পরিস্থিতির মধ্যেও অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আশা করছেন—রোজার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। মার্চ মাসে রমজান শুরু হচ্ছে। এই রোজার পর মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা।

শুধু অর্থ উপদেষ্টাই নন, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি একাধিক অনুষ্ঠানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছেন।

এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

প্রসঙ্গত, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছর, অর্থাৎ আগামী জুনের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেট-বিষয়ক বিশেষ বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

এদিকে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত ১০ শতাংশ রেখে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে।

চলতি বছরের জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নামবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের জুনে মূল্যস্ফীতি নামবে ৫ ভাগে।’ আরেকটি অনুষ্ঠানে গভর্নর জানান, দেশে আগামী জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপগুলো কার্যকর হচ্ছে না বলে সমালোচনা শুনেছি। বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতেও এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পর সুফল পেতে ১০ থেকে ১২ মাস সময় লাগে। আশা করছি আগামী জুনের মধ্যে বড় অগ্রগতি হবে।’

এদিকে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এখন আমাদের অগ্রাধিকার কর্মসূচি। তাই রমজান মাসে ভোক্তাদের স্বস্তিতে রাখতে যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি কথাগুলো বলেন। এ সময় তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও আওতাধীন দফতরগুলোর কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বাণিজ্য সচিব টিসিবির চলমান পণ্য বিক্রয় কার্যক্রমে মনিটরিং বা তদারকি জোরদার করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।

আগের দিন মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) অর্থ উপদেষ্টা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চাল, ডাল, চিনির সরবরাহ নিশ্চিত করছি। চিনির দাম অনেকটাই সহনীয়। বাকিগুলো যাতে সহনীয় দামে আসে সেজন্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। অনেক সময় সঠিক দামে ভোক্তা পণ্য পায় না।’ তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, মজুত যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যাবো।’

ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘রোজার সময় যাতে কোনোভাবে দাম না বাড়ে সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ১ শতাংশ কমেছে। এটি যাতে ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে বাজেট দেওয়ার সময় সহনীয় অবস্থায় আসে।’ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি হলেই জীবনযাপনের মান কমে যায়। এবার বড় একটি (পণ্যের) অংশ আমাদের আমদানি করতে হয়েছে। এটি আমাদের বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এরপরও রোজার পর মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ এর আগে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্তরা কষ্টে আছে, নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী ও দিনমজুরদের ওপর চাপ বাড়ছে।’

এর আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের কোনও লুকোছাপা নেই এবং মূল্যস্ফীতির পূর্ণ তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

অধ্যাপক ইউনূস আরও উল্লেখ করেন, সরকার মুদ্রানীতি ও বাজেট নীতির সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে আগামী মে মাস নাগাদ এসব পদক্ষেপের সুফল পাওয়া যাবে এবং জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে, তিনি স্বীকার করেছেন যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয় এবং এটি দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই, সরকার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে আশাবাদের পেছনে যুক্তি

বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, যার ফলে অতিরিক্ত টাকা সরবরাহ কমানো হচ্ছে। সরকার নতুন করে টাকা ছাপানো বন্ধ রেখেছে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। আমদানি পর্যায়ে কড়াকড়ি আরোপ ও ডলার সংকট কিছুটা কমে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে?

বাজারে চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমছে না, বরং দফায় দফায় বাড়ছে। পরিবহন খরচ এবং চাঁদাবাজির কারণে পণ্য বাজারে আসার আগেই দাম বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, সরবরাহ কম থাকায় বাজারে স্থিতিশীলতা আসছে না। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্য অস্থির থাকায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু আশাবাদ প্রকাশ করলেই হবে না, বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাজার মনিটরিং জোরদার, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং আমদানি ব্যয় কমানোর মতো কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা দুরূহই থেকে যাবে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে মূল্যস্ফীতি কমার আশা করা যায়, তবে এটি নির্ভর করছে বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কমার কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, তবে এটি দ্রুত নেমে আসবে কিনা, তা নির্ভর করছে কয়েকটি মূল বিষয়ের ওপর।

মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাব্য কারণ

সুদের হার বৃদ্ধি: কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি কঠোর করছে, ফলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে।

আমদানি নিয়ন্ত্রণ: ডলারের ওপর চাপ কমাতে এবং রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে আমদানির ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ভারসাম্য রক্ষা হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল করা: টাকার অবমূল্যায়ন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, যা আমদানি ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে রফতানিকারকদের জন্য এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল হওয়া: টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছে, যা আমদানি ব্যয় কমিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে পারে।

সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন: সরকার বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে টিসিবি ও অন্যান্য মাধ্যমকে সক্রিয় করেছে, যা বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে।

সরবরাহ চেইন মজবুতকরণ: খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে টিসিবির কার্যক্রম জোরদার করাও রয়েছে।

বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে, যা আমদানি ব্যয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম কমলে দেশীয় বাজারেও মূল্যস্ফীতির চাপ কমতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে।

তবে মূল্যস্ফীতি কমার হার ধীর হবে, কারণ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে কাজ করছে। টেকসই উন্নতির জন্য কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং কৃষি খাতকে আরও উৎপাদনশীল করে তুলতে হবে।

যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়ে গেছে

খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনও বেশি, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম যদি আবার বাড়ানো হয়, তাহলে তা অন্যান্য খরচকেও বাড়িয়ে দিতে পারে। রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনও চাপের মুখে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

পরিস্থিতির সম্ভাব্য পূর্বাভাস

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষের দিকে মূল্যস্ফীতি ধাপে ধাপে কমতে পারে, যদি নীতি সহায়ক থাকে এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি বড় কোনও ধাক্কা না খায়। তবে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়।





Source link

এই বিষয়ের আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

এই বিষয়ে সর্বাধিক পঠিত