Homeঅর্থনীতিশুল্ক ঘা দেওয়ার পর ট্রাম্পের হাতে ‘ডলার কূটনীতির’ মুগুর

শুল্ক ঘা দেওয়ার পর ট্রাম্পের হাতে ‘ডলার কূটনীতির’ মুগুর


ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আগেই নানা শঙ্কা ছিল ইউরোপসহ মিত্রদেশগুলোর। এবার সেই শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে; কারণ, মার্কিন প্রশাসন শুধু শুল্ক আরোপেই থেমে নেই। ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক আরোপের ফাঁড়া কাটানোর আগেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, তিনি এবার মিত্রদেশগুলোকে চাপ দিতে ডলার ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

শুধু ডলার নয়; ফেডারেল রিজার্ভের ‘সোয়াপ লাইন’, ভিসা-মাস্টারকার্ডের মতো পেমেন্ট জায়ান্ট কিংবা মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেম—সবকিছু নিয়েই এখন চলছে হিসাব-নিকাশ। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের করণীয় কী, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহল।

এ নিয়ে সম্পূরক এক প্রতিবেদন করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবর্তক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে নানা ধরনের কৌশল—ক্রেডিট কার্ড থেকে শুরু করে বিদেশি ব্যাংকগুলোয় ডলারের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা পর্যন্ত।

এ ধরনের অপ্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করলে যুক্তরাষ্ট্রকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তা উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে এমন ‘আশঙ্কা’ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ব্যর্থ হলে বর্তমান শ্রমবাজারের টানাপোড়েনে সম্ভব না-ও হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ব্যারি আইচেনগ্রিন বলেন, ‘আমি খুব ভালোভাবেই কল্পনা করতে পারি, ট্রাম্প হতাশ হয়ে এমন কিছু অদ্ভুত ধারণা বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে পারেন, যেগুলোর পেছনে কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি নেই।’

মার-আ-লাগো চুক্তির ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বাণিজ্য ভারসাম্য আনতে ডলারকে দুর্বল করার একটি কৌশল নিয়ে ভাবছে। এই উদ্দেশ্যে তারা বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সহায়তায় তাদের নিজস্ব মুদ্রার মান পুনর্মূল্যায়ন করতে চাইছে।

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত স্টিফেন মিরানের একটি প্রবন্ধে এই ধারণাকে বলা হয়েছে ‘মার-আ-লাগো অ্যাকর্ড’। ১৯৮৫ সালের ডলার-নিয়ন্ত্রণমূলক ‘প্লাজা অ্যাকর্ড’-এর অনুকরণে এবং ট্রাম্পের ফ্লোরিডার অবকাশকেন্দ্র মার-আ-লাগোর নাম মিলিয়ে এ নামকরণ করা হয়েছে।

এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শুল্ক আরোপের হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্যান্য দেশকে তাদের মুদ্রার মান বাড়াতে বাধ্য করা হতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপ কিংবা চীনে এ ধরনের চুক্তির বাস্তবায়ন এখনকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব।

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের সিনিয়র ফেলো মউরিস অবস্টফেল্ড বলেন, ‘আমি মনে করি, এই ধারণা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’

মউরিস অবস্টফেল্ড বলেন, যেহেতু শুল্ক এরই মধ্যে আরোপ করা হয়েছে, তাই সেগুলোকে আর হুমকি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্পষ্ট অবস্থানের কারণে বৈশ্বিক নিরাপত্তায় তাদের অঙ্গীকার নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে।

ইউরোপীয় অঞ্চল, জাপান বা ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও এমন কোনো চুক্তিতে যেতে চাইবে না, যাতে তাদের সুদের হার বাড়িয়ে মন্দার ঝুঁকি নিতে হয়।

অন্যদিকে টিএস লম্বার্ডের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রেয়া বিমিশ বলেন, চীনের দুর্বল অর্থনীতিকে চাঙা করতে হলে ইউয়ানের মান বৃদ্ধি নয়, বরং নীতিগতভাবে মুদ্রার মান কমানো প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে মুদ্রার মান বাড়ানো অর্থহীন।

জাপানের ক্ষেত্রেও বিগত ২৫ বছরের মূল্যস্ফীতি সংকটের স্মৃতি এখনো সতেজ। ফলে শক্তিশালী ইয়েন চালু করার ক্ষেত্রে দেশটি অনাগ্রহ দেখাতে পারে।

ডলার অস্ত্রের আশঙ্কায় ইউরোপ

কোনো বৈশ্বিক চুক্তি না হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও আগ্রাসী কৌশলের আশ্রয় নিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তার মধ্যে অন্যতম হতে পারে—বিশ্ব বাণিজ্য, সঞ্চয় ও বিনিয়োগে ব্যবহৃত প্রধান মুদ্রা ডলারের অবস্থানকে কাজে লাগানো।

পিটারসন ইনস্টিটিউটের গবেষক মউরিস অবস্টফেল্ড এবং কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংকারের মতে, এর একটি রূপ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সোয়াপ লাইন বন্ধ করে দেওয়া; যার মাধ্যমে বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের মুদ্রা জামানত রেখে ডলার ধার নিতে পারে।

অর্থবাজারে অচলাবস্থা দেখা দিলে এবং বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তার জন্য ডলারমুখী হলে এই সোয়াপ লাইন হয় তাঁদের আখেরে সম্বল। এই সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ডলার ঋণের বাজারে বড় ধাক্কা লাগবে। বিশেষ করে ব্রিটেন, ইউরোপীয় অঞ্চল এবং জাপানের ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সোয়াপ লাইন চালু বা বন্ধ করার ক্ষমতা এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের। ট্রাম্প কখনো প্রকাশ্যে এটি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার ইঙ্গিত দেননি। তবু সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক বদলের কারণে পর্যবেক্ষকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

থিন আইস ম্যাক্রোইকোনমিকসের প্রতিষ্ঠাতা স্পাইরস অ্যান্ড্রিওপোলাস বলেন, একটি বড় চুক্তির দর-কষাকষিতে এটি ‘পারমাণবিক হুমকি’ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে; এখন সেটা আর অবিশ্বাস্য শোনায় না।

স্পাইরস অ্যান্ড্রিওপোলাসের মতে, এমন পদক্ষেপ ডলারকে বিশ্বস্ত বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে তাঁর মর্যাদা হারাতে বাধ্য করবে।

ডলার-২

ক্রেডিট কার্ড কূটনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আরও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার রয়েছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পেমেন্ট জায়ান্ট ভিসা ও মাস্টারকার্ড। জাপান ও চীন নিজস্ব ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুললেও ইউরোপের ২০টি দেশের গড়ে দুই-তৃতীয়াংশ কার্ড লেনদেন এই দুই মার্কিন কোম্পানির মাধ্যমেই হয়ে থাকে।

অ্যাপল ও গুগলের মতো মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মোবাইল পেমেন্ট সেবাও এখন ইউরোপে খুচরা লেনদেনের প্রায় ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসেই ইউরোপের এই বাজারের পরিমাণ ছিল ১১৩ ট্রিলিয়ন ইউরোর বেশি।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর যেমন ভিসা ও মাস্টারকার্ড সেখান থেকে সরে গিয়েছিল, তেমনি ইউরোপ থেকে সেবা বন্ধ করতে তাদের বাধ্য করা হলে ভোক্তাদের বিকল্পহীন হয়ে নগদ অর্থ বা ঝামেলাপূর্ণ ব্যাংক ট্রান্সফারের ওপর নির্ভর করতে হবে।

ইউরোপের কনফারেন্স বোর্ড থিংকট্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মারিয়া ডেমার্টজিস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বৈরী আচরণ করলে সেটা আমাদের জন্য বড় ধাক্কা হবে।’

ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক এরই মধ্যে এই নির্ভরশীলতাকে ‘অর্থনৈতিক চাপ ও জোরজবরদস্তির ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর সমাধান হিসেবে তারা ‘ডিজিটাল ইউরো’ চালুর কথা বলছে। তবে এই পরিকল্পনা নানা আলোচনা ও অনিশ্চয়তায় জর্জরিত এবং বাস্তবায়িত হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

প্রতিক্রিয়ার হিসাব

ট্রাম্পের এমন সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। তারা পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে বা চরম পদক্ষেপ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে মার্কিন ব্যাংকের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে পারে।

তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। কারণ, ওয়াল স্ট্রিটের আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসার ক্ষতির আশঙ্কায় তারা হাত গুটাতে বাধ্য হতে পারে।

তবু রয়টার্সকে দেওয়া একাধিক আন্তর্জাতিক ব্যাংক নির্বাহীর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে ইউরোপের পাল্টা পদক্ষেপের আশঙ্কায় তাঁরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন।





Source link

এই বিষয়ের আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

এই বিষয়ে সর্বাধিক পঠিত