নতুন মার্কিন শুল্কের জবাবে গতকাল শুক্রবার চীন পাল্টা জবাব হিসেবে সব মার্কিন পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। গত মার্চের শুরুতে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্যের ওপর আরোপিত ১০-১৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে এই নতুন শুল্ক যোগ হলো। চীনের এই পাল্টা জবাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অবস্থা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার আগে সামনে এসেছে বাণিজ্যের গতিপথের মোড় পরিবর্তনের আলোচনা। বিশ্ব অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া এই বাণিজ্য যুদ্ধের নতুন এই ঘাত-প্রতিঘাত মার্কিন কৃষির ওপর হানতে যাচ্ছে বড় আঘাত। যত দ্রুত সম্ভব কৃষিপণ্যের বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে নিতে চায় বেইজিং।
শিকাগোভিত্তিক প্রাইস ফিউচার্স গ্রুপের সহসভাপতি জ্যাক স্কোভিল বলেন, ‘এটা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রপ্তানি ব্যবসায় ক্ষতি করবে। আমরা সবাইকে রাগিয়ে দিচ্ছি। সেটাই সমস্যা। যদি আমরা সবার ওপর শুল্ক আরোপ করি, তাহলে আমরা যাব কোথায়?’
শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হওয়া সয়াবিন চুক্তির দাম ৩৪.৫ সেন্ট কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি বুশেল $৯.৭৭-এ। এটা ২০২৫ সালের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম দাম।
চীনে শস্য ও তেলবীজ বিক্রি করা একটি আন্তর্জাতিক ট্রেডিং কোম্পানির সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এটা যেন সব ধরনের মার্কিন কৃষিপণ্যের আমদানি বন্ধ করে দেওয়ার মতো। ৩৪ শতাংশ শুল্কের কারণে কোনো আমদানি আদৌ লাভজনক হবে কি না, সে নিয়ে সন্দেহ আছে।’
একজন ইউরোপীয় শস্য ব্যবসায়ী বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং তারাও সম্ভবত মার্কিন সয়াবিনের ওপর শুল্ক আরোপ করবে। তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু এখন সয়াবিন ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রে সয়াবিনের পরবর্তী ফসল ওঠার আগে কোনো সমঝোতা না হলে সেটি বেশ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।’
সামগ্রিকভাবে এই পুরো বাণিজ্য যুদ্ধ মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য নেতিবাচক এবং অন্যান্য উৎপাদনকারীদের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে বলছে, এই বাণিজ্য যুদ্ধে দফায় দফায় আরোপিত শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে। যার প্রভাবে লাভবান হচ্ছে ব্রাজিল। বৈশ্বিক সয়াবিন আমদানি চাহিদা এখন ব্রাজিলের দিকে সরে যাচ্ছে। সেখানে ভালো ফসল হওয়ায় চীন দ্বিতীয় প্রান্তিকে রেকর্ড পরিমাণ সয়াবিন আমদানি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃষি ও খাদ্য খাতভিত্তিক র্যাবোব্যাংকের কৃষিপণ্য বাজার গবেষণা প্রধান কার্লোস মেরা বলেন, ‘ব্রাজিল নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে। তারা একমাত্র দেশ যারা চীনের জন্য মার্কিন সয়াবিনের বিকল্প সরবরাহকারী হতে পারে। তবে আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ের মতো অন্য দেশগুলোও উপকৃত হতে পারে। বিশেষ করে গম রপ্তানির মাধ্যমে লাভবান হবে অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনা।’
এ প্রসঙ্গে হেজপয়েন্ট গ্লোবাল মার্কেটস-এর লাতিন আমেরিকা শস্য বিক্রয় প্রধান সোল আর্কিডিয়াকোনো বলেন, বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ায় মৌসুমী প্রভাব ও রেকর্ড ফসল সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকায় সয়াবিনের স্থানীয় দাম বছরজুড়ে শক্তিশালী থাকবে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্ভবত কৃষকদের আরও বেশি সয়াবিন উৎপাদনে উৎসাহিত করবে, বিশেষ করে ব্রাজিলে, যেখানে সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ কিছুটা ধীরগতিতে ছিল।
ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার একদিন পর গত বৃহস্পতিবার ব্রাজিলের বন্দর প্রিমিয়াম (বন্দরের অতিরিক্ত দাম) শিকাগোর সূচক মূল্য থেকে প্রতি বুশেলে এক ডলার বেড়ে গিয়েছিল।
ট্রাম্প গত ৫ এপ্রিল থেকে সব আমদানির ওপর ১০ শতাংশ ভিত্তিমূল্য শুল্ক এবং কিছু নির্দিষ্ট দেশের ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, যার মধ্যে চীনের জন্য ৩৪ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
চীন এখনো মার্কিন কৃষিপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার, তবে গত দুই বছর ধরে মার্কিন কৃষিপণ্যের আমদানি কমছে। ২০২২ সালে এই আমদানি ছিল ৪২.৮ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু ২০২৪ সালে তা কমে ২৯.২৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যে গত শুক্রবার চীন খাদ্য নিরাপত্তা সমস্যা দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরগম (জোয়ার) আমদানির কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি বাতিল করেছে। একইসঙ্গে, আমেরিকান প্রোটিনস, ডেলাওয়ারের মাউন্টেয়ার ফার্মস ও ডারলিং ইনগ্রেডিয়েন্টস-এর কাছ থেকে পোলট্রি মাংস ও হাড়গুঁড়ার আমদানির অনুমতিপত্রও বাতিল করেছে। পাশাপাশি চীন ডেলাওয়ারের মাউন্টেয়ার ফার্মস ও কোস্টাল প্রসেসিং-এর পোলট্রি পণ্য আমদানিও স্থগিত করেছে।