সাহিত্য বিভাগের নির্ধারিত প্রশ্নে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন কবি সানাউল্লাহ সাগর। তিনি ১৯৮৬ সালের ৪ আগস্ট বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলাধীন দক্ষিণ ভূতের দিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা জীবনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে এমএ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ থেকে এমএসএস শেষ করেন। দীর্ঘদিন ধরে ‘আড্ডা’ নামে একটি লিটলম্যাগ সম্পাদনা করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১২টি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ: ‘সাইরেন’, ‘কালো হাসির জার্নাল’, ‘মেঘের কার্তুজ’, ‘পৃথিবী সমান দূরত্ব আমাদের’, ‘গুহা’, ‘লাবণ্য দাশের সাথে দেখা হওয়ার পর’ এবং ‘নির্বাচিত কবিতা’।
বাংলা ট্রিবিউন: কোন বিষয় বা অনুভূতি আপনাকে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করে?
সানাউল্লাহ সাগর: কবিতা জীবনেরই অংশ। আর সে কারণে যাপিত জীবনের প্রতিটি ঘটনা আমার কবিতা বিষয়ক চিন্তায় ছাপ রাখে। তবে এমন হয় যে জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্য থেকে কোনো কোনো ঘটনা বেশি নাড়া দেয় বা গুরুত্ব পায়। আর সে বিষয়টি মাথায় চেপে বসে। কিছু একটা চিন্তা করতে বাধ্য করে। লিখতে বাধ্য করে। এমন করেই কবিতার জন্ম হয়। নির্ধারিত কোনো বিষয় বা অনুভূতির জন্য সে অপেক্ষা করে না।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি কী ধরনের থিম বা বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
সানাউল্লাহ সাগর: নির্ধারিত তেমন কোনো বিষয় নেই। তবে কিছু বিষয় হয়ত বেশি প্রভাবিত করে। যখন লিখি তখন সচেতনভাবে সবসময় বিষয় নির্বাচন করেই লিখতে বসি তেমন নয়। হঠাৎ-ই কোনো বিষয় ভেতরে নাড়া দেয়। সেটা বাথরুমে কিংবা ব্যস্ত লোকাল বাসের মধ্যেও ঘটে।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তাৎক্ষণিক অনুপ্রেরণায় লেখেন, নাকি ধীরে ধীরে শব্দ সাজান?
সানাউল্লাহ সাগর: আমার ক্ষেত্রে দুটোই ঘটে। তবে বেশিরভাগ সময়ই কোনো একটি বিষয় নিয়ে প্রথম একটা লাইন মাথায় আসে। গানের মতো মাথার মধ্যে সে বাজতে থাকে। বাজতেই থাকে। বাজতে বাজতে তার কলেবর বাড়ে। তারপর ধীরে ধীরে এই চিন্তাটি একটি কবিতায় রূপ নেয়।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার কবিতার ভাষা ও শৈলী কীভাবে বেছে নেন?
সানাউল্লাহ সাগর: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমার কবিতার ভাষা ও শৈলী লেখার থিমের উপর নির্ভর করে। আবার এমনও হয় যে প্রথমে একটি অবয়ব দাঁড় করাই। এরপর তাকে সাজাতে থাকি। সাজানো শেষে একটি কবিতার পূর্ণ শরীর নির্মাণ হয়। তবে এটা খুব বেশি হয় না। অধিকাংশ সময়ই প্রথমে যে খসড়াটি তৈরি হয় তার থিমের উপরই বলার ঢঙটা তৈরি হয়।
বাংলা ট্রিবিউন: কোন কোন কবির প্রভাব আপনার লেখায় আছে?
সানাউল্লাহ সাগর: লেখার একেবারে প্রথম দিকে কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব ছিল। যদিও সে লেখাগুলো কোথাও প্রকাশিত হয়নি। কারণ লেখা শুরু করার ৫/৬ বছর পর মনে হয়েছিল আমি আমার লেখা লিখছি না। কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো লিখতে চেষ্টা করছি। তখন পুরাতন সব লেখা বাদ দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করলাম। নিজের কথাগুলো নিজের মতো করে বলতে চেষ্টা করলাম। তারপর একে একে কবিতার বইগুলো প্রকাশিত হলো। বই প্রকাশ হওয়ার পর থেকে নিজের বিচারে কারো প্রভাব আছে তেমনটা কখনো মনে হয়নি।
বাংলা ট্রিবিউন: কথাসাহিত্যের চর্চা করেন? এ চর্চা আপনার কবিতায় কতটুকু প্রভাব রাখে?
সানাউল্লাহ সাগর: আমার চিন্তাগুলো কখনো কবিতায় আবার কখনো গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে প্রকাশ করি। তবে কোনো চিন্তাটি কোন অবয়বে প্রকাশ করব সেটা থিম ও গল্পের উপর নির্ভর করে। কবিতা লিখে যেমন আমি আনন্দ লাভ করি তেমন কথাসাহিত্য চর্চায় আমার আনন্দ হয়। প্রতিটি লেখা শেষ করার পর নিজের কাছে নিজেকে দাঁড় করিয়ে খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার মতো আনন্দ পাই। যদিও প্রথম দর্শনে ভালো লাগলেও পরক্ষণেই আবার দ্বিধা তৈরি হয়। ভাবনার দোলায় দুলতে থাকি ভাবতে থাকি। মনে হয় যেভাবে বলতে চেয়েছি সেভাবে হয়ত বলতে পারলাম না। নিজের মধ্যে এক ধরনের অতৃপ্তি লেগেই থাকে। সেই তৃষ্ণা থেকেই পরবর্তী লেখার জন্য নিজেকে তৈরি করতে থাকি। লেখালেখি শুরুটা কবিতা দিয়ে হলেও আমার ইচ্ছে ছিল কথাসাহিত্যেও কিছু একটা করার। সেই চিন্তা থেকে প্রথম দিকেই উপন্যাসের মতো কিছু একটা লিখেছিলাম। তারপর পুরাতন সব লেখা বাদ দিয়ে ২০০৭ সালের দিকে আবার যখন নতুন করে শুরু করলাম তখন সেসব উপন্যাসও বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম। গদ্যে প্রথম দিকে শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের খুব প্রভাব ছিল। এটা বুঝতে পারার পর লেখা বন্ধ করে দেই। আবার ৬ বছর বিরতি দিয়ে ২০১৩ সালে শুরু করি। দু-একটি গল্প প্রকাশিতও হয়। কিন্তু এবারও মনে হয় নিজের মতো করে বলতে পারছি না। আবার ৬ বছরের বিরতি। তারপর আবার শুরু করি ২০১৮ সালে। এবার কিছুটা আত্মবিশ্বাস টের পাই। এবং কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও নিয়মিত হই। তারপর একে একে আমার ৩টি গদ্যের বই প্রকাশিত হয়। একটি ছোটগল্প ও দুটি উপন্যাস। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরও ৪টি গদ্যের বই।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রথম কবিতার বই সম্পর্কে কিছু বলুন। প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি কেমন ছিল?
সানাউল্লাহ সাগর: প্রথম দিকের লেখা বাদ দিয়ে দেয়ার পর আবার যখন নতুন করে লেখা শুরু করি তখন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশিত লিটলম্যাগ, জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় কবিবন্ধুদের আলোচনায় ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে আমার লেখা কবিতাগুলো। ছাপা লেখাগুলোর পেপার কাটিং ও লিটলম্যাগগুলো যত্ন করে রাখতাম। এরই মধ্যে ২০০৭ সালে `আড্ডা’ নামে একটি ছোটকাগজ প্রকাশের মাধ্যমে লিটলম্যাগ আন্দোলনে জড়িয়ে যাই। কবিবন্ধুরা বই প্রকাশের কথা বলতে থাকে। সহযোদ্ধা অনিন্দ্য দ্বীপ, সীমান্ত হেলাল, মোহাম্মদ জসিমের প্ররোচনায় ২০১০ সালে প্রথম পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হয়ে যায়। কিন্তু তরুণ কবির বই কে প্রকাশ করবে? এমনিতে কবিতার বই তার উপর অখ্যাত তরুণ। কি আর করা, ২০১৩ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে সামনে রেখে বরিশাল থেকে নিজের টাকাই প্রকাশ করে ফেললাম প্রথম কবিতার বই ‘অলৌকিক স্বপ্নের যৌথ বিবৃতি’। প্রথম কবিতার বই প্রকাশ হওয়ার পর এক ধরনের ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল— যে এতদিন লেখালেখির পর অন্তত একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো একসাথে সংকলিত হলো এটাই আনন্দ। মনে পড়ে অখ্যাত তরুণ কবির এই বইটির পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কবি সবীর সরকার ‘বাক্’ ওয়েবম্যাগে ও কবি বন্ধু সাফিনা আক্তার ভোরের কাগজের সাহিত্য পাতায় একটি আলোচনা লিখেছিলেন।
বাংলা ট্রিবিউন: সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা কি আপনার কবিতায় প্রভাব ফেলে? যদি ফেলে, তবে কীভাবে তা প্রকাশিত হয়?
সানাউল্লাহ সাগর: কবিতায় সব কিছুই প্রভাব ফেলে। হয়ত কখনো কখনো তাজা বিষয় নিয়ে লেখা হয় কবিতা। আবার কখনো দীর্ঘ পুরাতন বিষয় যা স্মৃতির জঠরে জমা হয়ে থাকে তা হুট করে চিন্তার রাজপথে চলে আসে। তখন লেখা তৈরি হয়ে যায়। তবে আমার লেখায় সমকালীন বিষয় ঘটনার সাথে সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে সরাসরি তেমন আসে না। তবে প্রভাবিত হই। তবে সেটা আস্তে আস্তে লেখায় আসে। আমি এটা নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করি না। বিশ্বাস করি যখন আসার তখন আসবে চাপাচাপি করে লিখতেই হবে এমন করে লিখি না।
বাংলা ট্রিবিউন: পাঠকদের মন্তব্য আপনার লেখায় কোনো পরিবর্তন আনে?
সানাউল্লাহ সাগর: পাঠকের মন্তব্যে লেখায় পরিবর্তন আনায় আমি বিশ্বাসী না। আমি বিশ্বাস করি শিল্পী তার মতো করে নিজের চিন্তা প্রকাশ করবেন। সেটা হয়ত কারো ভালো লাগবে আবার কারো ভালো লাগবে না। কেউ কানেক্ট করতে পারবেন আবার কেউ কানেক্ট করতে পারবেন না। যারা কানেক্ট করতে পারবেন লেখাটা তাদের জন্যই। তারপরও একজন কবি বা কথাসাহিত্যিক যখন তার ম্যাসেজ থ্রো করেন তার কিছু টার্গেট পিপল তো থাকেই। সেটা তার লেখা পড়লেই পাঠকরা বুঝতে পারবেন তার লেখাটা আসলে কাদের জন্য। কিন্তু যদি কেউ মন্তব্য করে লেখায় পরিবর্তন আনায় উৎসাহিত করেন আমার মনে হয় না তাতে কোনো শিল্পী নিজের চিন্তার কোনো পরিবর্তন ঘটাবেন। বরং প্রকৃত শিল্পী নিজের মতো করেই কাজ করে যাবেন। এটাই একজন কবির প্রকৃত পথ বলেই আমি বিশ্বাস করি।
বাংলা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে কী ধরনের কবিতা লিখতে চান? নতুন কোনো ধারা বা শৈলীতে কাজ করার ইচ্ছা আছে কি?
সানাউল্লাহ সাগর: কবিতায় আমি নিরীক্ষায় বিশ্বাস করি। সে কারণে আমার প্রতিটি বইয়ের লেখা পূর্ববর্তী বইয়ের কবিতার থেকে ভিন্নতা নিয়ে হাজির হয়। এই ভিন্নতা তৈরিতে যখন ভাটা পড়বে তখন আমি কবিতা লেখা বন্ধ করে দিব এমনটাই নিজের কাছে আমি কমিটেড। আর নতুন কোনো ধারা বা শৈলীতে কাজ করার ইচ্ছা অবশ্যই আছে। এমন তৃষ্ণাই আমাকে নতুন একটি কবিতা লিখতে উৎসাহিত করে। শিল্প সৃষ্টিতে প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চাই। আরও অনেক কাজ করতে চাই। যত দিন নতুন সৃষ্টির দম আছে বলে বিশ্বাস থাকবে। ততদিন লিখব।