Homeজাতীয়সংলাপে যা বললেন প্রধান উপদেষ্টা

সংলাপে যা বললেন প্রধান উপদেষ্টা


অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের রূপান্তর পর্বে প্রবেশ করার অধিকার অর্জন করেছি। এই রূপান্তর সহজভাবে কার্যকর করার জন্য আমাদের সব শক্তি নিয়োজিত করার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। সংলাপের তিনটি বিষয় ‘ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন’ গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কার বিষয়ে আমাদের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন।

জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) দুই দিনব্যাপী জাতীয় সংলাপ শুরু হয়েছে। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বেসরকারি সংগঠন ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ (এফবিএস) আয়োজিত সংলাপের উদ্দেশ্য ‘ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন’। এতে প্রধান অতিথি হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভার্চুয়ালি অংশ নেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, যাদের অঙ্গহানি হয়েছে– তাদের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ হওয়ার নয়। নতুন বাংলাদেশ গঠনে তাদের প্রেরণা ও অবদান জাতি কখনও ভুলতে পারবে না।

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের রূপান্তর পর্বে প্রবেশ করার অধিকার অর্জন করেছি। এই রূপান্তর দ্রুত সফলভাবে কার্যকর করার জন্য আমাদের সব শক্তি নিয়োজিত করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে হবে। পেছনে ফেরার কোনও সুযোগ নেই। আমাদের এই কাঙ্ক্ষিত রূপান্তরের লক্ষ‍্য হবে সব ধরনের বৈষম্য অবসানের রাজনৈতিক আয়োজন নিশ্চিত করা, এ দেশে গণতান্ত্রিক ও নাগরিক সমতা ভিত্তিক একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ন‍্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ ছাড়া জুলাইয়ের শহীদদের আত্মদান অর্থবহ হতে পারে না। ফ‍্যাসিবাদ বাংলাদেশকে আদর্শভিত্তিক সব ধরনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে গভীর অন্ধকারের দিকে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। আমরা আবার প্রিয় বাংলাদেশকে সাম‍্য, মানবিক মর্যাদা ও ন‍্যায়বিচারের পথে ফেরাবার লক্ষ‍ে কাজ করছি। ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের পক্ষ থেকে আপনাদের এই জাতীয় সংলাপ আমাদের আমাদের নতুন কক্ষপথ রচনা এবং তার যথাযথ স্থাপনে বিশেষভাবে সাহায্য করবে।

তিনি বলেন, সংলাপে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন। সংস্কার বিষয়ে আমাদের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন। এই তিন লক্ষ্যের কোনোটিকে ছাড়া কোনোটি সফল হতে পারবে না। ঐক্যবিহীন সংস্কার কিংবা সংস্কারবিহীন নির্বাচন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পারবে না।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের ছাত্রজনতা অটুট সাহসে শিশুহত্যাকারী ও পৈশাচিক ঘাতকদের মোকাবিলা করেছে। মানবতার বিরুদ্ধে এমন নিষ্ঠুরতাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। গুম-খুন থেকে জুলাই গণহত্যার বিচারের চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সংলাপের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে আমি আশ্বস্ত হয়েছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশকে মুক্তই করেনি, আমাদের স্বপ্নকেও তুমুল সাহসী করে তুলেছে। বাকহীন বাংলাদেশ জোরালো কণ্ঠে আবার কথা বলার শক্তি ফিরে পেয়েছে। এই দৃঢ় কণ্ঠ আবার ঐক্য গঠনে সোচ্চার হয়েছে।

ঐক্য আমাদের মূল শক্তি। জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের ঐতিহাসিক মাত্রায় বলিয়ান করেছে। গত পাঁচ মাসে এই ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধ শক্তি আমাদের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করার ক্রমাগত প্রয়াস চালাতে থাকায় আমাদের ঐক্য আরো মজবুত হচ্ছে, যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ঐক‍্যের জোরেই এখন আমরা অসাধ্য সাধন করতে পারি। এখনই আমাদের সর্বোচ্চ সুযোগ। এমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে যেটা সব নাগরিকের জন্য সম্পদের ও সুযোগের বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা দেবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যত নিম্ন আয়ের পরিবারেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, প্রতিটি নাগরিকের, তিনি নারী হোক, আর পুরুষই হোক তিনি যেন বিনা বাধায় তো বটেই বরং রাষ্ট্রের আয়োজনে তার সৃজনশীলতা প্রকাশ করে যেকোনও পর্যায়ের উদ্যোক্তা হতে পারেন। অথবা তিনি যে ধরনের কর্মজীবন চান তাই বেছে নিতে পারবেন।

তিনি বলেন, এমন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশ থাকবে যেখানে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু এই পরিচিতি অবান্তর হয়ে পড়বে। সবার একটিই পরিচয়, আমি বাংলাদেশের নাগরিক এবং রাষ্ট্র আমাকে আমার সব অধিকার দিতে বাধ্য। রাষ্ট্রের কাছে এবং অন্য নাগরিকের কাছে আমার অন্য কোনও পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। যেখানে ব্যক্তি বন্দনার কোনও সুযোগ থাকবে না। দেশের ভেতরে বা বাইরে প্রভু-ভৃত‍্যের কোনও সম্পর্কের সুযোগ থাকবে না।

তিরি আরও বলেন, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার সুবাদে হবো বিশ্ব নাগরিক। দেশের মঙ্গল সাধন করা যেমন হবে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব, তেমনই বিশ্বের মঙ্গল সাধন করাও আমাদের কর্তব্য। এ দায়িত্বও আমরা সমানভাবে পালন করবো। আমাদের তরুণ-তরুণীরা দ্রুত এই দুই দায়িত্ব সমানভাবে পালন করার জন্য প্রস্তুতি নেবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী অতিক্রম করে আমরা এক ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের বিনিময়ে অপূর্ব সুযোগের মুহূর্ত সৃষ্টি করেছি। এই সুযোগ যদি আমরা গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হই, কিংবা অপারগ হই, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কোনও প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। আজকের সংলাপের মূল লক্ষ্য হলো সবার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা দেওয়া, আমরা এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া হতে দেব না। আমরা একতাবদ্ধভাবে এই সুযোগের প্রতিটি মুহূর্ত সর্বোত্তম কাজে লাগাবো।’

তিনি বলেন, সংস্কারের যে দায়িত্ব ঐতিহাসিক কারণে আমাদের কাছে এসেছে, এই দায়িত্ব পালনে আমাদের প্রত্যেককে– প্রতি নাগরিককে, রাজনৈতিক দলকে, প্রতিটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রত্যেককে দৃঢ়তার সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কে কীভাবে এই মহা গৌরবের দায়িত্ব পালন করবেন, আজ আপনাদের সংলাপে ঘোষণা দিন।

সংস্কার ও নির্বাচনের প্রস্তুতি একই সঙ্গে চলতে থাকবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতির কাজ মূলত নির্বাচন কমিশনের। নাগরিকদের নির্বাচনের তারিখ না-পাওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় সময় দিতে হয় না। কিন্তু সংস্কারের কাজে সব নাগরিককে অংশ নিতে হবে। যারা ভোটার তারা তো অংশগ্রহণ করবেনই, তার সঙ্গে যারা ভবিষ্যতে ভোটার হবেন তারাও সর্বাত্মকভাবে সংস্কারের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করুন।

তিনি বলেন, সংস্কারের কাজটা নাগরিকদের জন্য সহজ করতে আমরা ১৫টি সংস্কার কমিশন গঠন করে দিয়েছিলাম। তাদের প্রতিবেদন আমরা জানুয়ারি মাসে পেয়ে যাবো। প্রত‍্যেক সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব হলো প্রধান বিকল্পগুলো চিহ্নিত করে তার মধ‍্য থেকে একটি বিকল্পকে জাতির জন‍্য সুপারিশ করা। যার যার ক্ষেত্রে সংস্কারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ কীভাবে রচিত হবে তা বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে সুপারিশমালা তৈরি করে দেওয়া, নাগরিকদের পক্ষে মতামত স্থির করা সহজ করে দেওয়া। তবে কমিশনের প্রতিবেদনে সুপারিশ করলেই আমাকে-আপনাকে তা মেনে নিতে হবে এমন কোনও কথা নেই। এ জন্য সর্বশেষ পর্যায়ে জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন গঠন করা হয়েছে।

ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর নির্ধারণ করা উচিত মন্তব্য করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশন কী সুপারিশ করবেন তা আমার জানা নেই। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষ যদি কমিশনের সুপারিশ করা বয়স পছন্দ করে, ঐকমত‍্যে পৌঁছার জন‍্য আমি তা মেনে নেবো।

সংস্কার কমিশনগুলো অনেক সুপারিশ তুলে ধরবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি, যার যাই মতামত হোক না কেন আমরা দ্রুত একটা ঐকমত‍্য প্রতিষ্ঠিত করে সংস্কারের কাজগুলো করে ফেলতে চাই। নির্বাচনের পথে যেন এগিয়ে যেতে পারি সেই ব্যবস্থা করতে চাই। আজকের সংলাপ জাতির সামনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি প্রক্রিয়া তুলে ধরে আমাদের দায়িত্বকে সহজ এবং গতিময় করে দেবে বলে আশা করছি।





Source link

এই বিষয়ের আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

এই বিষয়ে সর্বাধিক পঠিত