দেশের অর্থনীতি এই বছরে বৈদেশিক ঋণ, তার সুদ পরিশোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে যে ঋণ পাওয়া যাচ্ছিল, তা গত বছরের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণও বেড়েছে, যার ফলে সরকারের আর্থিক অবস্থা আরও সংকুচিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত জানুয়ারি মাসের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বিদেশি ঋণের ছাড় ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে এবং ঋণের প্রতিশ্রুতি ৬৭ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা প্রায় ৮ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। তবে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, আর সেই ঋণের সুদ পরিশোধের চাপও সরকারের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের এখন যে পরিমাণ অর্থ ঋণের সুদ পরিশোধে খরচ হচ্ছে, তা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের কাছ থেকে পাওয়া ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক জটিলতা উল্লেখ করা হচ্ছে। সরকারি ঋণ-সম্পর্কিত নতুন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান দিতে এই অস্থিরতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ থেকে ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল, সেগুলো আর আসছে না, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় আঘাত হেনেছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে যদি তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান না করা হয়। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এখনো প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে, যা প্রকল্পের জন্য জরুরি তহবিলের প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, সরকারের উচিত দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, যাতে প্রকল্পের অগ্রগতি সচল রাখা যায়।
এদিকে একদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা চলমান। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য সরকার ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তা ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় এসে দাঁড়ায়। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৪১ হাজার ২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক সমস্যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর সুদ পরিশোধের পরিমাণ ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একদিকে সরকারের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের অভাবও তৈরি করছে। দেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি, তাদের প্রতিশ্রুতি এবং ঋণছাড়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবের কারণে অগ্রগতি কমিয়ে দিয়েছে।
চলতি অর্থবছর উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। এ উন্নয়ন সহযোগীটি অর্থ ছাড় করেছে ১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক অর্থ ছাড় করেছে ৮৬ কোটি ডলারের কিছু বেশি। তবে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে বিশ্বব্যাংক। ৯৪ কোটি ডলারের বেশি প্রতিশ্রুতি এসেছে সংস্থাটির কাছ থেকে। এ সংস্থাই এ বছর সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি। এখন তারা তাদের ঋণ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া বড় দেশগুলো যেমন ভারত, চীন এবং রাশিয়া ঋণ দিতে আগ্রহী নয়, যার ফলে সরকারের জন্য উন্নয়ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত অর্থের সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি ঋণের পরিমাণ ও তার সুদ পরিশোধের চাপ যত বাড়বে, ততই সরকারের জন্য বাজেটের তহবিল পুনর্বণ্টন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট সৃষ্টি করতে পারে; কারণ, সরকারকে ঋণ পরিশোধে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে, যা নতুন উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করা কঠিন করে তুলছে। ইআরডি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ৩৯৩ কোটি ৮৮ লাখ ডলার ঋণছাড় হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩৯ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। এই ঋণ ছাড়ে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ হ্রাস পাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কতা সংকেত।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সরবরাহ নিশ্চিত করা। নতুন ঋণদাতা দেশগুলোর কাছে সরকারি ঋণ নেওয়া হলেও তার পুনঃপর্যালোচনা এবং প্রতিশ্রুতির দিক থেকে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আগামী বছরগুলোয় ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ সরকারকে আরও বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করবে।